২৭ অক্টোবর ২০২০ ০৩:৫০ পূর্বাহ্ন     |    ই-পেপার     |     English
২৭ অক্টোবর ২০২০   |  ই-পেপার   |   English
দহন ধর্ষণের যাঁতাকলে এমসি কলেজ: মুক্তি কবে?
দহন ধর্ষণের যাঁতাকলে এমসি কলেজ: মুক্তি কবে?

কাসমির রেজা:

সেপ্টেম্বর ২৮, ২০২০ ০১:০৯ পিএম

গত এক দশকে এমসি কলেজ তিনবার পত্রিকার পাতা জুড়ে শিরোনাম হয়েছে। এর কোনো বারই শিক্ষা প্রতিষ্ঠান হিসেবে ফলাফল, সহশিক্ষা কার্যক্রম বা অন্য কোন সুনামের কারনে নয়। শিরোনাম হয়েছে সন্ত্রাস, অগ্নি সংযোগ ও ধর্ষণের মত নেতিবাচক ঘটনার কারনে। ২০১২ সালে হোস্টেলে অগ্নি সংযোগ, ২০১৬ সালে খাদিজা নামে এক ছাত্রীকে কুপানো, আর সর্বশেষ গত ২৫ সেপ্টেম্বর স্বামীর কাছ থেকে স্ত্রীকে ছিনিয়ে নিয়ে গণ ধর্ষণ করার জন্য এমসি কলেজ সংবাদ শিরোনাম হয়। অথচ এই কলেজটি এক কালে শিরোনাম হত নোবেল বিজয়ী কবির আগমন কিংবা সাহিত্য সভাকে ঘিরে। 

শুধু সিলেট নয় গোটা আসাম জুড়ে শিক্ষা বিস্তারে প্রধান অবলম্বন ছিল ১২৮ বছর বয়সী এই শিক্ষা প্রতিষ্ঠান। সিলেটের ইতিহাসে যত মহান রাজনৈতিক নেতা বা জ্ঞানী গুণিজন আছেন বা ছিলেন তাদের প্রায় সবাই এমসি কলেজের ছাত্র। তাই অনেকেই গর্ব করে বলেন ‘আমি এমসি কলেজের ছাত্র’। কিন্তু এসব ঘৃণ্য ঘটনার পর তারা কি আর এমসি কলেজের ছাত্র বলে গর্ব করতে পারছেন? 

এতো গেলো এমসি কলেজের কথা। পূণ্যভূমি সিলেটেরও রয়েছে দেশব্যাপী সুনাম। শাহজালালের এই মাটি পূতঃপবিত্র। এমন ধর্ষণের ঘটনা সিলেটের সুনামকেও ভুলন্ঠিত করেছে। সিলেটবাসী তাই খুবই বিক্ষুব্ধ হয়েছেন। হয়েছেন প্রতিবাদ মুখর। তারা এই ঘটনার বিচার চাইছেন। তবে অতীতে কয়েকটি ঘটনার বিচার না হওয়ায় এই ধর্ষণের বিচার হবে কী না তা নিয়ে অনেকেই সন্দেহ পোষণ করেছেন। অনেকেই এসব অপকর্মের হোতাদের খুঁটির জোর কোথায় তা খুঁজছেন। কেউ কেউ বলছেন আগের ঘটনার বিচার না হওয়ায় অপরাধীরা আরও বেপরোয়া হয়ে আবির্ভূত হয়েছে। কেউ কেউ দহন আর ধর্ষণের ঘটনার সরলীকরন করছেন। বলছেন সবাই একই সুত্রে গাঁথা।

দেশের বিভিন্ন প্রত্যন্ত এলাকা থেকে ছাত্রছাত্রীরা এসে এমসি কলেজে ভর্তি হয়। এখানে প্রভাবশালীদের হম্বিতম্বিকে তারা মোটেও ভাল ভাবে নেয় না। তারা সবাই প্রতিবাদ না করলেও প্রচন্ডভাবে বিক্ষুব্ধ হয়। এই ধর্ষণের ঘটনার পর কলেজটির এক সাবেক ছাত্র ফেসবুক স্টেটাসে লিখেছেন - বছর পাঁচেক আগে টিলাগড় পয়েন্টে এক রেস্টুরেন্টে এক নেতাকে টেবিল ফেনের পাশের সিট না ছেড়ে দেওয়ার কারনে তাকে অপদস্ত করা হয়। এজন্য তার হৃদয়ে যে রক্ত ক্ষরণ হয়েছে তা তিনি এখনো ভুলতে পারেননি। এখানে এমন ছোটখাট ঘটনা থেকে শুরু করে ছাত্রছাত্রীদের শারিরীক ভাবে লাঞ্চিত হওয়ার ঘটনা ঘটছে প্রতিনিয়ত। ঘটনার সাথে সরকারী দলের সম্পৃক্ততা থাকুক বা না থাকুক নানাভাবে এসব ঘটনার জন্য সরকারের ভাবমূর্তি নষ্ট হচ্ছে। মাননীয় প্রধানমন্ত্রী বঙ্গবন্ধু কন্যা শেখ হাসিনা সব সময় এসব ঘৃণ্য ঘটনার ব্যাপারে জিরো টলারেন্সের কথা ঘোষণা করছেন। সরকার ও দেশের ভাবমূর্তি উন্নয়নে তিনি রাত দিন পরিশ্রম করছেন। উন্নয়নের নানা সূচকে বাংলাদেশ উল্লেখযোগ্য উন্নতি করেছে। বলা হচ্ছে উন্নয়নের রোল মডেল। কিন্তু এসব ঘটনার যদি সুষ্ঠু বিচার না হয়, একজন বিবাহিত পুরুষ যদি নির্বিঘেœ তার স্ত্রীকে নিয়ে শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের মতো পবিত্র স্থানে ঘুরে বেড়াতে না পারেন তবে এসব উন্নয়ন তার কাছে নস্যি মনে হতেই পারে। তাই এসব বিষফোড়াকে এখনই অপসারণ করতে হবে। এদের রাজনৈতিক পরিচয় মুখ্য নয়। দেশে শৃঙ্খলা বিরাজ রাখার স্বার্থে সরকারের দায়িত্ব এদের বিচার করা। সরকারী দলের বিভিন্ন দায়িত্বশীল নেতা কর্মীরা যেভাবে এ ঘটনার বিচার চেয়ে সোচ্চার হয়েছেন তা দেশবাসীকে আশ্বস্থ করতেই পারে। এখন সরকারের দায়িত্ব এই আশ্বাসের মূল্য দেওয়া ও দোষীদের দৃষ্ঠান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত করা। এর বিচার না হলে পরিস্থিতি হবে আরও ভয়ানক। এরা আভির্ভুত হবে ফ্রাঙ্কেস্টাইন হয়ে। ঐতিহ্য আর গৌরবের এমসি কলেজ যেন আর দহন বা ধর্ষণের কারনে শিরোনাম না হয়। এমসি কলেজ আবার যেন শিরোনাম হয় কোন গৌরবোজ্জল ঘটনার জন্য সেই প্রত্যাশায় রইলাম।

 লেখক: সভাপতি, পরিবেশ ও হাওর উন্নয়ন সংস্থা

ই/ডি