২৪ নভেম্বর ২০২০ ১২:৪১ অপরাহ্ন     |    ই-পেপার     |     English
২৪ নভেম্বর ২০২০   |  ই-পেপার   |   English
বিশ্বকে নতুন করে ভাবতে হবে
বিশ্বকে নতুন করে ভাবতে হবে

ম. আমিনুল হক চুন্নু

নভেম্বর ০২, ২০২০ ০৯:০৮ পিএম

মানুষ সামনে চলার জন্য যখন নতুন আশা, নতুন স্বপ্ন নিয়ে পা বাড়ায় তখন পেছনে তার সব  আবর্জনা, জীর্ন পুরাতনকে অতীতের গর্ভে ভাসিয়ে দিয়ে নতুন সূর্য আহবান করে। পুরোনো বছরের  স্মৃতিকে স্মরণ করে, তাকে সঙ্গী করে না। আমরা ২০১৯ কে গুডবাই জানিয়ে যখন ২০২০ এর  দোরপাড়ায়, তখন অবশ্যই আমাদের আলোড়িত করে দেশীয় এবং বিশ্ব পরিসরে’ ১৯-এ ঘটে যাওয়া  বিশেষ ঘটনাবলী। বিশ্ব জানে আজকের দুনিয়ার বড় শত্রু এবং বড় সংকট জঙ্গিবাদ। শান্তি ও  সভ্যতার জন্য এ এক ভংয়কর চ্যালেঞ্জ। এ চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় বিশ্বের সব পরাক্রমদেশ থেকে শুরু  করে সব দেশই হিমশিম খাচ্ছে। ২০১৯ সালের জঙ্গিবাদের হামলা থেকে বিশ্বব্যাপী পরিত্রান পায়নি।  বছরের শুরুতেই বিশ্বকে চমকে দেয় শান্তি প্রিয় দেশ নিউজিল্যান্ডের ক্রাইস্ট চার্চ মসজিদে জঙ্গি  হামলা। সেই হামলায় প্রায় অর্ধশতাধিক মানুষের প্রান হানি বিশ্বকে শোকে বিহবল করে দেয়।  নিউজিল্যান্ডের সেই ট্রমা কাটিয়ে ওঠতে না উঠতেই আবার শ্রীলকায় হামলা। যা জানান দেয় বিশ্বকে  এই জঙ্গিবাদ কঠোরভাবে মোকাবিলা করতে হবে। না পারলে আরো ভয়াবহ মূল্য দিতে হবে।  

এদিকে আমেরিকার ইতিহাসে আলোড়ন তুলেছে এবং যা নিয়ে বিশ্বেও তোলপাড় চলছে, সেই ঘটনা  প্রেসিডেন্ট ডোলান ট্রাম্পের ইমপিচমেন্ট। আমেরিকার হাউজ অব রিপ্রেজেনটেটিভে ইতি মধ্যেই  প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প ইমপিডে হয়েছেন। এখন সিনেটের সিদ্ধান্তের ওপর নির্ভর করছে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের  ভাগ্য। তবে অভিশংসিত না হলেও আগামী নির্বাচনে ভোটারদের ওপর বড় ধরনের প্রভাব ফেলবে  বলে মনে করা হচ্ছে। আমেরিকা- নর্থ কোরিয়া কয়েক দফা আলোচনাও ২০১৯ এর ঘটনা পঞ্জি  আলোচিত অংশ হয়ে থাকবে। এই সঙ্গে চীন- যুক্তিরাষ্ট্র বানিজ্য যুদ্ধ বা বানিজ্য সংকটও বিশ্বের  অন্যতম আলোচিত বিষয় ২০১৯- এর। অন্যদিকে মধ্যপাচ্য পরিস্থিতিতে সাংবাদিক খাশোগির হত্যা  কান্ড নিয়ে আলোচনা অনেকটা স্তিমিত হয়ে এলেও এখনো চলছে। এতে বিশে^ ব্যাপী সৌদি আরবের  ভাবমূর্তি যথেষ্ট মলিন হয়েছে। ইরানের সংঙ্গে আমেরিকার টানাপোড়েনও আলোচনায় ছিল বিদায়ী  বছরে। অন্যদিকে আন্তর্জাতিক বিশ্বে তোলপাড় তোলা ঘটনা ভারতের এনআরসি যার মধ্যে রয়েছে  মুসলিম বিদে¦ষ এবং মুসলিম বিতাড়নের ভংয়কর অভিসন্ধি প্রথম বাবরী মসজিদ নিয়ে মুসলমানদের  দাবির বিরুদ্ধে আদালতের রায়, দ্বিতীয়টি আরো ভয়ংকর। আসাম দিয়ে শুরু হলেও সমগ্র ভারত  থেকেই মুসলিম খেদাও চক্রান্ত ভারতের বর্তমান হিন্দুত্ব বাদী সরকার বিজেপির। এনআরসি নামে  ভারতে বসবাসকারী ভারতীয় মুসলমানদের বিতাড়নের নীলনকশা। এ নিয়ে ভারত জুড়ে চলছে 

প্রতিবাদ- বিক্ষোভ পুলিশ অ্যাকশ্যন। রক্তপাত- প্রানহানিতে ভেসে গেছে ভারতের ধর্মনিরপেক্ষ  আদর্শ। ভারতের জন্ম ভিত্তি টলটলায়মান। বিশ^ব্যাপী এখন একটি বিষয় সবাই জানে যে, মিয়ানমার  সরকার এবং সে দেশের সেনাবাহিনীর যোগসাজশে মিয়ানমারের বৈধ নাগরিক রোহিঙ্গাদের নিধন করা  হচ্ছে, ঘরবাড়ি জ¦ালিয়ে দেয়া হচ্ছে, মা -বোনকে ধর্ষন করা হচ্ছে। এই নির্যাতনের মুখে তারা  রাখাইন রাজ্যে তাদের পূর্ব পুরুষদের ভিটেমাটি, ঘরবাড়ি ছেড়ে জীবন বাঁচাতে প্রতিবেশি বাংলাদেশে  আশ্রয় নেয়। বাংলাদেশ মানবাধিকার ও মানবিকারের ডাকে সাড়া দিয়ে তাদের আগমন প্রতিরোধের  ব্যবস্থা না নিয়ে আশ্রয় দেয়। ২০১৭ এর আগষ্ট থেকে এ পর্যন্ত প্রায় ১২ লাখ রোহিঙ্গা বাংলাদেশে  আশ্রয় গ্রহন করেছে। কিন্তু অবস্থাদৃষ্টে মনে হচ্ছে, বাংলাদেশের সেই মানবিক মূল্যবোধ এখন তাদের  গলার কাঁটা হয়ে বিঁধতে শুরু করেছে। এখন জাতিসংঘ স্বীকার করেছে যে রোহিঙ্গাদের বিরুদ্ধে  মিয়ানমার সেনাবাহিনী নিধনয  চালানো প্রতিহত করার ক্ষেত্রে তাদের ব্যর্থতা ছিল। জাতিসংঘের  একটি অভ্যন্তরীন প্রতিবেদনে এ কথা স্বীকার করা হয়েছে। তাছাড়া পৃথিবীর ফুসফস আমাজানের  আগুনের ঘটনা সারা বছরই ছিল খবরের শিরোনামে। বিশে^র ২০ শতাংশ অক্সিজেনের যোগানদাতা  এ বনে ২০১৯ প্রায় ৭৫ হাজার বার আগুন লাগার কথা জানা গেছে। ব্রাজিল সরকারের  দায়িত্বহীনতার কথাও এ সময় উঠে আসে। এ আগুন কে বৈশি^ক সংকট বলে ও অভিহিত করেন বিশ^  নেতারা। অন্যদিকে বছর জুড়ে বায়ু পানি শব্দ দুষনে জর্জরিত বাংলাদেশ। বিশে^র সব দেশের দূষিত  বায়ুর শহর হিসেবে যেসব শহরের নাম ২০১৯ সালে বারবার উচ্চারিত হয়েছে বাংলাদেশ এর  রাজধানী ঢাকা তার মধ্যে একটি। সম্প্রতি ঢাকাসহ সারা দেশে বায়ুদূষন প্রকট আকার ধারন  করেছে। বছর জুড়েই ভয়াবহ বায়ূ দূষণ শিকার হয়ে আলোচনায় ছিল রাজধানী ঢাকা এবং  আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থা সাউথ এশিয়ার ওয়াচের মহাসচিব ও এশিয়ান আমেরিকান  ডেমোক্রেটিক সোসাইটির কো- চেয়ারম্যান শহীদুল ইসলাম তালুকদার বলেন, এশিয়া ও দক্ষিণ পূর্ব  এশিয়ার দেশগুলো বিশেষ করে মিয়ানমার , ইসরায়েল, সৌদিআরব, সিরিয়া ও ইরান সহ পৃথিবীর  অনান্য মানবাধীকার লঙ্গনকারী দেশের বিরুদ্ধে বিশ্ব বিবেক জাগ্রত করে সত্যিকারের মানবাধিকার  প্রতিষ্টা করা সম্ভব। তবে বিশ^জুড়ে মানবাধিকার মূলমন্ত্র এটাই যে, প্রতিটি রাষ্ট্রকে মানবাধিকার  সংরক্ষনের জন্য যথাযথ ব্যবস্থা নিতে হবে এবং ব্যর্থতার দায়ভার রাষ্ট্রের কাধেঁই বর্তাবে। অন্যদিকে  ভারত নাগরিকত্ব বিল পাস করে দক্ষিন এশিয়া তথা বিশে^র মানবাধিকারের প্রতি চপেটাসাত করল।  

কিন্তু বিশ্ব সংস্থা “জাতিসংঘ” এ নিয়ে ইদানিং বহুপ্রশ্ন উত্থাপিত হতে দেখা যায়। জাতিসংঘের বিরুদ্ধে  বিশেষেত দূর্বল দেশগুলোর অভিযোগ এবং সমালোচনার অন্ত নেই। অনেকেই জাতিসংঘকে তার  ভূমিকার কারনে নখর দন্তহীন বাঘের সঙ্গে তুলনা করেন। 

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধকালীন যে প্রেক্ষাপটে জাতি সংঘের মতো একটি আন্তর্জাতিক সংস্থা গঠনের  প্রয়োজনীয়তা সে সময় মিত্র শক্তির দেশগুলো অনুভব করে ১৯৪২ সালে আটলান্টিক সনদের  ঘোষনায় স্বাক্ষর করেন এবং ১৯৪৫ সালের ২৪ অক্টোবর আনুষ্ঠানিকভাবে জাতিসংঘের যাত্রা শুরু  হয়। জাতিসংঘ এখন তা থেকে অনেক দূরে বলে রাষ্ট্রবিজ্ঞানী অনেকের অভিমত। জতি সংঘের  বিরুদ্ধে সবচেয়ে বড় অভিযোগ সে তার জন্মের লক্ষ্য, উদ্দেশ্য ও অঙ্গীকার রক্ষা করে চলছে না।  বিশ্ব শান্তি ও নিরাপত্তা রক্ষার অঙ্গীকার নিয়ে যাত্রা শুরু করলেও যে এখন পথ হারিয়েছে, সে কথা  অহরহই শোনা যায়। বর্তমানে জাতিসংঘের সদস্য ১৯৩ টি দেশ। ৫ টি স্থায়ী সদস্য নিয়ে  জাতিসংঘের সবচেয়ে শক্তিশালী শাখা নিরাপত্তা পরিষদ। মোট সদস্য ১৫। পাঁচটি স্থায়ী সদস্য ভোট  ক্ষমতার অধিকারী। তবে পৃথিবীব্যাপী মানবাধিকার গনতন্ত্র ও গনতান্ত্রিক মূল্যবোধকে প্রতিষ্টিত  করতে হলে প্রথমে এই ৫ টি দেশকে সাধারন পরিষদের অন্যান্য দেশগুলোর পর্যায়ে নিয়ে আসতে  হবে। তাদের ভোটের ক্ষমতা থেকে বি ত করতে হবে। তাহলে সহজেই বিশ্ব মানবাধিকর প্রতিষ্টার  পথ সুগম হবে।অন্যদিকে বাংলাদেশে অনেকগুলো উল্লেখযোগ্য ঘটনার মধ্য দিয়ে পার হয়েছে  ২০১৯। বাংলাদেশে রোহিঙ্গা ইস্যুও কোনো সমাধান হয়নি ২০১৯ সালেও। তবে রোহিঙ্গা ইস্যু নিয়ে  মিয়ানমারের বিরুদ্ধে গাম্বিয়ার মামলা উল্লেখযোগ্য ঘটনা। এ ছাড়া বাংলাদেশে ২০১৯ সালে কয়েকটি  মৃত্যু মানুষকে গভীরভাবে শোকাহত করেছে। তাদের মধ্যে আছেন বিশ্বের বৃহত্তম এনজিও প্রতিষ্টাতা  স্যার ফজলে হাসান আবেদ। সাবেক প্রধান বিচারপতি মাহমুদুল আমীন চৌধুরী, সাবেক রাষ্ট্রপতি  এবং জাতীয় পার্টির চেয়ারম্যান হুসেইন মুহাম্মদ এরশাদ, রাজনীতিবিদ, মুজিব নগর সরকারের  উপদেষ্টা পরিষদের অন্যতম সদস্য, ন্যাশনাল আওয়ামী পার্টি ন্যাপ সভাপতি অধ্যাপক মোজাফ্ফর  আহমদ, দেশ বরন্যে নাট্যকার, অভিনেতা, নাট্যব্যক্তিত্ব ও ভাষাসৈনিক মমতাজ উদ্দীন আহমদ  বিশিষ্ট শিক্ষাবিদ- পদার্থ বিজ্ঞানী অঞ্জয় রায়, জাসদ নেতা মঈন উদ্দীন খান বাদল এমপি, অখন্ড  ঢাকা সিটি করপোরেশনের সাবেক মেয়র সাদেক হোসেন খোকার মৃত্যু। মানুষের মৃর্ত্যু স্বভাবিক।  তবে যেসব মৃর্ত্যু পাহাড়ের চেয়েও ভারী, তাদেরই মধ্যে উল্লেখিত মৃত্যুগুলো এর বাইরে বুয়েটের  আবরার ফাহাদ এবং ফেনীর নুসরাত রাফির হত্যা কান্ড আলোচিত ঘটনা। আরো উল্লেখযোগ্য  ঘটনার মধ্যে রয়েছে বিশ্বের ১ নম্বার ক্রিকেট অলরাউন্ডার সাকিব আল হাসানের ক্রিকেট জগৎ থেকে  বহিস্কার, আর আছে পেঁয়াজ কছড়া। পেঁয়াজ নাকি বাংলাদেশের সবচেয়ে আলোচিত চরিত্র। দেশের  মানুষের জীবনকে দূর্বিষহ করে তোলে এই পেঁয়াজ। পেঁয়াজের ব্যবসায়ীদের সিন্ডিকেটের অকল্পনীয়  সাফল্যে লবন ব্যবসায়ীরা মালকোচা মেরে তৈরি হয়ে ছিলেন। মিডিয়ার চেঁচামেচির কারণে তাঁরা  পিছিয়ে যান। কিন্তু অন্যান্য পণ্যের ব্যবসায়ীদের যে প্রস্তুতি নেই, তা বলা যাবে না। তাঁদের কুমতলব  প্রতিহত করার প্রস্তুতি সরকারের আছে তা মনে করার কোনো কারণ নেই। 

তবে বুয়েটের আবরার হত্যাকান্ডের মর্মান্তক ঘটনা যদি না ঘটত, তাহলে বুয়েট ও অন্যান্য পাবলিক  বিশ্ববিদ্যালয়ের চিত্র মানুষের অনেক টাই অজানা থাকত। ছাত্র সংগঠনের নেতার দৌরাত্ম্য না  থামাতে পারলে স্থিতিশীল সরকারের ভাবমূর্তি ক্ষুন্ন হবে। আইনশৃংখলা রক্ষাকারী বাহিনী ইসলামি  জঙ্গিদের দমন করে সফল হয়েছে, ছাত্রসংগঠনের কর্মীদের গায়ে তারা হাত দেবে না যখন পর্যন্ত  সরকারি দলের শীর্ষ নেতাদের নির্দেশ না পায়। কিন্তু ক্যাসিনো অনেক দিনের পুরোনো মামলা, হঠাৎ  তার বিষ্ফোরন ঘটে। যুবলীগের সম্মেলনের আগে হয়তো তার প্রয়োজন ছিল। তবে অপকর্ম, জুয়া,  দুর্নীতির বিরুদ্ধে সরকার আরও অবস্থান নেবে, জনগনের সেটাই প্রত্যাশা। তাছাড়া ছাত্রলীগের সঙ্গে  সঙ্গে এই বছর খবরের শিরোনাম হয়েছেন সম্মানীত ভাইস চ্যান্সেলররা। শিক্ষা কিংবা গবেষনায়  কোনো মহান অবদানের জন্য নয়, নানা ধরনের অপকর্মের জন্য। একটি বিশ^বিদ্যালয়ে একজন  ভাইস চ্যান্সেলর হচ্ছেন মুঘল স¤্রাটদের মতো। তদের হাতে সব ক্ষমতা। যদিও নানা ধরনের  কমিটির সিদ্ধান্ত নিয়ে বিশ^বিদ্যালয় চালানোর কথা কিন্তু বাস্তবে সব কমিটি থাকে তাদের হাতের  মুঠোয় এবং ছোট একটি বিশ^বিদ্যালয়। কেমন চলছে সেটি পুরোপুরি নির্ভর করে সেই বিশ্ববিদ্যালয়ের  ভাইস চ্যান্সেলরের ওপর, কাজেই সেই ভাইস চ্যান্সেলর মানুষটি যদি নিজে একজন শিক্ষাবিদ কিংবা  গবেষক না হন হাহলে সেই বিশ্ববিদ্যালয়টি গড়ে উঠবে কেমন করে দেশের সবচেয়ে বড় দূর্ভাগ্য  হচ্ছে এখানে “লবিং’’ করে ভাইস চ্যান্সেলর হওয়া যায়।  

কিন্তু দুঃখের বিষয়, আজকে তেমন সব অনুষ্টান দেখা যায় না। বিশ্ববিদ্যালয়, কলেজে, স্কুলে বার্ষিক  খেলাধুলা আজ দিন দিন হারিয়ে যাচ্ছে। অন্যদিকে নোট বই মুখস্থ করা এবং কোচিং সেন্টারের  দৌরাত্ম্যে মা- বাবা সন্তানদের সারাক্ষন লেখাপড়ার মধ্যে ডুবিয়ে রাখার চেষ্টা করছেন। শরীর চর্চা  নেই, খেলাধুলা নেই। সুতরাং একদিকে যেমন তারা শুধু বই মুখস্থ মূখী হয়ে যাচ্ছে, অন্য দিকে  তেমনি বন্ধুত্ব, সৌর্হাদ্য এবং প্রতিযোগির মনোভাব ধীরে ধীরে কেমন যেন হারিয়ে যাচ্ছে। এক সময়  সাংস্কৃতিক অঙ্গন ও ছিল ছাত্রদের চরিত্র গঠনের একটি বড় উপাদান, নাটক হতো স্কুলে - কলেজে  সব জায়গায়, সাংস্কৃতিক সন্ধ্যা হতো, গান হতো, আবৃত্তি প্রযোগিতা হতো সবগুলো কোথায় যেন  হারিয়ে যাচ্ছে। এসব কর্মকান্ডে মন যেমন বিকশিত হয়, সুন্দর মনের সৃষ্টি হয়, তেমনি বন্ধুত্ব এবং  একে অন্যের কাছাকাছি হওয়ার মস্ত বড় সুযোগ সৃষ্টি হয় প্রশ্ন হলো ১. এই সুযোগগুলো হারিয়ে গেল  কেন? এসব নিয়ে আমাদের নতুন করে ভাবতে হবে। এই দায়িত্ব এক দিকে সব শিক্ষা +  প্রতিষ্টানের, তেমনি নেতৃত্ব দেওয়ার দায়িত্ব রাষ্ট্রের তথা সরকারের ২. উপচার্য, অধ্যক্ষ, শিক্ষক এবং  বিশ্ববিদ্যাল গুলোর প্রশাসনের অনেক দায়িত্ব রয়ে গেছে অতীতে যেমন শিক্ষক এবং ছাত্রদের মধ্যে  গভীর যোগাযোগ ছিল, শিক্ষকরা যেমন শ্রদ্ধার পাত্র ছিলেন ছাত্রদের কাছে, তেমন ছাত্ররাও  শিক্ষকদের কাছে স্নেহের ছিল। আজকে অনেক ক্ষেত্রে শুধু রাজনৈতিক মতভেদের কারনে অনেক 

দূরত্ব সৃষ্টি হয়েছে। এজন্য শিক্ষক, অধ্যক্ষ, উপাচার্য ও প্রশাসনে যারা আছেন, তাদের অনেক বেশি  দায়িত্ববান হতে হবে। শিক্ষকদের নিজেদের মধ্যে রাজনীতি করার সুযোগ এবং প্রবনতা নিয়েও  রাষ্ট্রকে ভাবতে হবে? আপনি যদি বিদেশে আসেন তখন দেখবেন, শিক্ষক ও ছাত্রদের মধ্যে কি  নিবিড় সম্পর্ক। ছাত্রদের সমস্যা হলে শিক্ষকদের কাছে যায়, হয়তো প্রশাসনের কাছেও যায়। সে  ক্ষেত্রে ছাত্র- শিক্ষকদের মধ্যে খোলামেলা আলোচনা করা যায়। আজকে ছাত্রদের সাথে শিক্ষকদের  সেই সম্পর্ক আছে কি না তা তারাই বিবেচনা করুক! নিশ্চয় অনেক শিক্ষক আছেন, তারা ছাত্রদের  কাছে অনেক শ্রদ্ধার পাত্র এবং শিক্ষকরা যে সিদ্ধান্ত দেন, সে সিদ্ধান্ত ছাত্র মাথা পেতে নেয়। কাজেই  শিক্ষকদের দায়িত্ব সম্পর্কে আরও বেশি সচেতন হতে হবে। প্রশাসনকে ও এ ব্যাপারে সচেতন হতে  হবে। চিন্তা করতে হবে আমরা যার যার দায়িত্ব সঠিকভাবে পালন করছি কি না। তবে আমি মনে  করি কোন সমস্যা হঠাৎ তৈরি হয়নি, ধীরে ধীরে পুঞ্জীভূত হয়েছে। এর ফলে আমরা যে ভবিষ্যতের  দিকে যাচ্ছি, সেটা আমাদের জন্য সুখবর হবে না।  

তাছাড়া মনে রাখতে হবে ছাত্রসমাজ দেশের ভবিষ্যৎ কর্ণধার। ছাত্র সমাজ আমাদের অতীতকে গড়ে  দিয়েছে। ছাত্রসরা আন্দোলন যদি না থাকত, তাহলে আজকে বাংলা রাষ্ট্রভাষা এবং স্বাধীন বাংলাদেশ  হতো না। তাই অপরাজনীতির বাহন হিসেবে ছাত্রদের যেন ব্যবহার না করা হয়, এটা আজকে  সাধারন মানুষের দাবি। তাই এ ব্যাপারে বিশেষ করে বাংলাদেশের রাজনীতিবিদের অনেক বেশি  সতর্ক হওয়া উচিত। তাছাড়া মানুষ হিসাবে মানুষের যে সামাজিক দায়বদ্ধতা, মানুষের সেই মানবিক  মূল্যবোধ ও মানুষকে সবসময় তার নিজস্ব পরিমন্ডলে আটকে রাখতে পারে না। নিজের সমাজ রাষ্ট্র  ছাড়িয়ে বিশ^ পরিমন্ডলে ছড়িয়ে পড়ে। তার কমর্, ভাবনা, স্বপ্ন ও পরিকল্পনা ও প্রয়াস দিয়ে বিশ্বকে ও  এগিয়ে যেতে ভূমিকা পালন করে। মানুষ সমাজে চলার জন্য যখন নতুন আশা, নতুন স্বপ্ন নিয়ে  সামনে পা বাড়ায় তখন পেছনে তার সব আবর্জনা জীর্ন পুরাতনকে অতীতের গর্ভে ভাসিয়ে দিয়ে  নতুন সূর্যকে আহবান করে। পুরনো বছরের স্মৃতিকে স্মরন করে তাকে সঙ্গী করে না। আমরা ২০১৯  কে গুড বাই জানিয়ে যখন ২০২০ এর দোরপাড়ায়, তখন অবশ্যই আমাদের আলোড়িত করে দেশীয়  এবং বিশ্ব পরিসরে ২০১৯-এ ঘটে যাওয়া বিশেষ ঘটনাবলী। বিশ্ব জানে আজকের দুনিয়ার বড় শত্রু  এবং বড় সংকট জঙ্গিবাদ। শান্তি ও সভ্যতার জন্য এ এক ভয়ংকর চ্যালেঞ্জ। এ চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায়  বিশ্বের সব পরাক্রমশালাদেশ থেকে শুরু করে সব দেশই হিমশিম খাচ্ছে। অন্যদিকে বিশ্ব অনেকবার  অনেক কিছুতে শংকিত হয়েছে। সভ্যতা ও শান্তি সংকটের মুখোমুখি দাঁড়িয়েছে, কখনো যুদ্ধ, কখনো  মহামারি, কখনো ঝড়,-জলোচ্ছাস, বিশ্বমান্দা। কিন্তু সভ্যতার এই চরম অগ্রগতি, বিজ্ঞানের বিস্তয়কর  উদ্ভানের এই সময়ে বিশ্বময় করোনা ভাইরাস নিয়ে যে শঙ্কা দেখা দিয়েছে তা যেন বিজ্ঞান, অগ্রগতি  উদ্ভাবন, সব কিছুকেই চ্যালেঞ্জ ছুড়ে দিয়েছে এবং বিশ্বময় কাপিঁয়ে দিচ্ছে প্রাণ বিধ্বংশী এই করোনা 

ভাইরাস। ভয়ের আরও কারণ বিজ্ঞানের এই অগ্রগতির যোগেও এখন পর্যন্ত কোন বিজ্ঞানী বা  গবেষকের পক্ষে এই ভাইরাস শাসনের কোনো প্রতিষেধক আবিস্কার করা সম্ভব হয় নি। তবে যত  দিন করোনা ভাইরাসের কার্যকর প্রতিষেধক আবিষ্কার না হচ্ছে তত দিন ব্যক্তিগত সতকথা অবলম্বনে  কোনো বিকল্প নেই এবং সতর্কভাবে চলাফেরাই আপনদত প্রধান প্রতিরোধক। কিন্তু মানুষের সকল  প্রয়াস, মেধা পরিকল্পনা, উদ্ভাবন, আবিষ্কার হউক মানব কল্যানে বিশ্ব শান্তি ও সভ্যতা রক্ষায়।  

বিশ্ব ও দেশবাসীর প্রত্যাশা মাদক ও জঙ্গিবাদ নির্মূল, করোনা ভাইরাসের কার্যকর প্রতিষেধক  আবিষ্কার হোক, দ্রব্যমূল্য নিয়ন্ত্রন, উন্নয়নের ধারাবাহিকতা বজায় রাখা, ক্ষুধা ও দারিদ্রমুক্ত সমাজ  গঠন, আইনশৃংখলা পরিস্থিতির উন্নয়ন ও মূলস্থীতি হৃাসসহ অর্থনৈতিক দুরাবস্থা থেকে ঘুরে দাড়ানোর  অফুরন্ত শক্তি। তাছাড়া মানুষ মানুষের কাছেও অসহায়, প্রকৃতির কাছেও অসহায়। মানুষ ও মানুষ  মারার জন্য, সভ্যতা ধ্বংশ করার জন্য ভয়ংকর সব অস্ত্র ব্যবহার করছে। প্রকৃতি ও প্রতিনিয়ত  প্রতিশোধক নিয়ে চলেছে মানুষের বিরুদ্ধে। সব শেষে বিশ্ব একটি মানবিক বিশ্ব হোক, প্রেমময় বিশ্ব  হোক এবং মানুষে মানুষে সম্প্রীতির বন্ধন দূঢ হোক। মানুষের সমৃদ্ধি ও কল্যান নিশ্চিত হোক এবং  আমরা যেন গাইতে পারি সুখ- শান্তি সম্প্রীতি ও সমৃদ্ধশালী বাংলাদেশ সহ বিশে^র দেশগুলোর জয়গান  তাছাড়াবিশ্বকে এখন নতুন করে কিছু ভাবার সময় এসেছে। জয় হোক মানবতার, জয় হোক  সভ্যতার। 

লেখক প্রফেসর ম. আমিনুল হক চুন্নু, গবেষক ও প্রতিষ্ঠাতা অধ্যক্ষ, নূরজাহান  মেমোরিয়াল মহিলা ডিগ্রি কলেজ, সিলেট। পিএইচ. ডি ফেলো। 

 

এস/এ