২৫ নভেম্বর ২০২০ ০২:২১ অপরাহ্ন     |    ই-পেপার     |     English
২৫ নভেম্বর ২০২০   |  ই-পেপার   |   English
আমার শিক্ষকতার সাতাশ বছর ও পুরনো প্যাঁচাল
আমার শিক্ষকতার সাতাশ বছর ও পুরনো প্যাঁচাল

মোঃ শফিউল আলম

নভেম্বর ২১, ২০২০ ০৫:২৪ পিএম

২০ নভেম্বর (শুক্রবার) ২০২০। সরকারি কলেজে আমার শিক্ষকতা জীবনের সাতাশ বছর পূর্ণ হলো। শুরু হলো আটাশ বছরের পথচলা। ১৪তম বিসিএস পরীক্ষার মাধ্যমে উত্তীর্ণ হয়ে সিলেটের এমসি কলেজের ইংরেজি বিভাগে প্রভাষক হিসেবে যোগদান করেছিলাম ১৯৯৩ সালের ২০ নভেম্বর। এই নভেম্বরে ১৪তম ব্যাচের আমার যে সকল সহকর্মী ইতোমধ্যে শিক্ষকতা জীবনের সাতাশ বছর পূর্ণ করেছেন বা করতে যাচ্ছেন তাঁদের সবাইকে আন্তরিক অভিনন্দন। পাশাপাশি অভিনন্দন জানাই ১৪তম বিসিএস-এর সকল সহকর্মীকে যাঁরা এ বছর অধ্যাপক পদে পদোন্নতি পেয়ে দীর্ঘ দিনের বঞ্ছনা থেকে মুক্তি পেলেন। বিলম্বে হলেও আমরা সবাই একই কাতারে শামিল হলাম।

একই সাথে দুঃখ ভারাক্রান্ত হৃদয়ে স্মরণ করছি আমাদের সেইসব সহকর্মীকে, যাঁরা একই সময়ে যোগদান করে শিক্ষকতার জীবন সাতাশ বছর পূর্ণ করার পূর্বেই আমাদের ছেড়ে চলে গিয়েছেন। তাঁদের বিদেহী আত্মার শান্তি কামনা করছি, তাঁদের  পরিবারবর্গের প্রতি গভীর সমবেদনা জ্ঞাপন করছি।    

শিক্ষকতা একই সাথে চ্যালেনজিং এবং ডিমান্ডিং একটি পেশা। প্রাপ্তি-অপ্রাপ্তি, যোগ-বিয়োগের নানা হিসেব কষে এই পেশায় তৃপ্ত থাকা সত্যি কঠিন। আমার শিক্ষকতা জীবনের এই সাতাশ বছরের পথ পরিক্রমায় তাই আমি নিজেকে যে প্রশ্নটি মাঝে-মধ্যেই করেছি তাহলো-আমি কেন শিক্ষকতা পেশা বেছে নিলাম? ইচ্ছায়, নাকি অনিচ্ছায়? আর শিক্ষক যখন হলামই, কেমন শিক্ষক হলাম? এই শেষ প্রশ্নটি আমি নিজেকে সবচেয়ে বেশিবার করেছি। নিজের প্রশ্নের উত্তর নিজেই দেয়ার চেষ্টা করেছি। কখনো কুণ্ঠিত  বোধ করেছি, কখনো গর্ব অনুভব করেছি। কুণ্ঠায় আড়ষ্ট হয়েছি এই ভেবে শিক্ষকতার মত একটি কঠিন এবং মহান পেশা বেছে নিয়ে পেশাটির প্রতি সবসময় সুবিচার হয়তো করতে পারিনি। আর শিক্ষক হিসেবে সবসময়ই গর্ব অনুভব করেছি আমার ছাত্রছাত্রীদের কৃতিত্বে, আপ্লুত হয়েছি তাদের ভালোবাসায়, তাদের শ্রদ্ধায়; ঋদ্ধ হয়েছি, আলোকিত হয়েছি, আলোড়িত হয়েছি আমার সহকর্মীদের সাহচর্যে, সহযোগিতায়, সহমর্মিতায়। তাঁদের কাছে আমার ঋণ অপরিসীম, অপরিশোধ্য।    

কোন পেশার প্রতি শ্রদ্ধা এবং ভালোবাসা না থাকলে সে পেশায় আসা একটি ঝুঁকিপূর্ণ সিদ্ধান্ত। আমি প্রথম শিক্ষকতা জীবন শুরু করি ১৯৯০ সালে রাজশাহীর মাদার বক্স মহিলা কলেজে। ছোট কলেজ, ছোট পরিসর, অল্প কিছু ছাত্রী। কিন্তু এই সব ‘ছোট-র মাঝেও আমি খুঁজে পেয়েছিলাম শিক্ষকতার মত বড় পেশার আনন্দ। হয়তো এই মাদার বক্স কলেজটি আমার শিক্ষকতা জীবনের প্রথম ভালোবাসা। তবে একথা সত্য যে, এই প্রথম ভালোবাসার স্থায়িত্ব নিয়ে কিছুটা দ্বিধান্বিত ছিলাম। ফলে দ্বিতীয় ভালোবাসার জন্য প্রশাসন কাডারের প্রতি কিছুটা আকৃষ্ট হয়ে পড়েছিলাম। হয়তো নিজেকে অন্যভাবে প্রমাণ করার সুপ্ত বাসনাও কাজ করেছিলো।  প্রায় দুই বছর শিক্ষকতা করার পর ১০ম বিসিএস পরীক্ষার মাধ্যমে উত্তীর্ণ হয়ে ১৯৯১ সনের ১১ই ডিসেম্বর প্রশাসন কাডারে যোগদান করি। প্রথম ভালোবাসার উচ্ছ্বাস ভুলে থাকা কঠিন। প্রশাসন কাডারের ভালোবাসা আমাকে ধরে রাখতে পারলো না। ১৪শ বিসিএস পরীক্ষার মাধ্যমে উত্তীর্ণ হয়ে ১৯৯৩ সনের ২০শে নভেম্বর সিলেটের এম. সি. কলেজে প্রভাষক হিসেবে যোগদানের মাধ্যমে শিক্ষকতা পেশায় ফিরে আসলাম। আবার এই এম. সি. কলেজেই আমার শিক্ষকতার সাতাশ বছর পূর্ণ হলো। এ যেন এক 'virtuous circle'। এমসি কলেজে যোগদান করার পর বুঝতে পারলাম আমার প্রথম ভালোবাসা শিক্ষকতাই আমার শেষ ভালোবাসা। এই ভালোবাসার কারণেই আমি পড়তে এবং পড়াতে আনন্দ পাই। আমি শিখতে এবং শেখাতে আনন্দ পাই।  

শিক্ষকতা আমার জন্য অনেকটা উত্তরাধিকারসূত্রে প্রাপ্ত বরমাল্যের মতো। কবি মুকুন্দরাম চক্রবর্তীর ভাষায় “কৃপা করি যদি মোরে দিলে বর দান”। কিছুটা যেন বংশগত দায়ভার বহন করার মতো। আমার দাদা ছিলেন একজন শিক্ষক। আমার বড় চাচা, আমার বড় ভাই শিক্ষক ছিলেন এবং তাঁরা আমারও শিক্ষক ছিলেন। আমার ছোট চাচাও কিছুদিন শিক্ষকতা করেছিলেন এবং তাঁর এক ছেলে এবং তিন মেয়েও শিক্ষক। সুতরাং আমাদের বংশটা শিক্ষকের বংশ বলা যায়। এই বংশগত প্রভাব ছাড়া, আমার ছাত্র জীবনের বিভিন্ন স্তরে আমার অনেক শ্রদ্ধাভাজন শিক্ষক আমাকে গভীরভাবে প্রভাবিত করেছেন। তবে সবচেয়ে বড় বিষয়টি হলো শিক্ষকতার প্রতি আমার নিজের ভালোলাগা, আমার নিজের ভালোবাসা।   

ইংরেজিতে একটি কথা আছে-'Comparison is odious', তুলনা একটি জঘন্য ব্যাপার। তার পরেও তুলনা বিচারে এ কথা অনস্বীকার্য,  শিক্ষা কাডারে প্রাপ্তির চেয়ে অপ্রাপ্তির পাল্লাই ভারী। পদোন্নতির ক্ষেত্রে রয়েছে  অনাকাঙ্ক্ষিত দীর্ঘসূত্রীতা, রয়েছে ব্যাচ ও বিষয়-ভিত্তিক চরম বৈষম্য। এ ছাড়া, পদসোপান এবং অর্জিত ছুটি, এবং সর্বপোরি ওয়ারেন্ট অভ প্রিসিডেন্স নিয়ে রয়েছে চরম হতাশা। রয়েছে মান-মর্যাদার প্রশ্ন। সব না পাওয়ার সমাধান আমাদের হাতে নেই। যেটুকু আছে তা আমরা কাজে লাগাতে পারছি না। আমরা গর্ব করে বলে থাকি বিসিএস (সাধারণ) শিক্ষা কাডার সবচেয়ে বড় কাডার। পাশাপাশি বৈচিত্র্যময়ও। কিন্ত দুঃখের বিষয়, এই বড়ত্ব এবং বৈচিত্র্য আমাদের ঐক্যবদ্ধ করার চেয়ে বিভক্তই বেশি করেছে। বিভক্তি শুধু বিভেদই বাড়ায়। সম্মিলিত কোন লক্ষ্য অর্জন করা যায় না। বড় কিছু পেতে হলে ঐক্যের কোন বিকল্প নেই। আর মর্যাদার প্রশ্নে বলা যায়-মর্যাদা যতটুকু না আরোপিত, তার চেয়ে অনেক বেশি অর্জিত একটি বিষয়। এটি অর্জনের জন্য প্রয়োজন জ্ঞান, দক্ষতা, সততা এবং স্বচ্ছ ভাবমূর্তি। পাশাপাশি প্রয়োজন পারস্পরিক শ্রদ্ধাবোধ।

তার পরেও আমার মতে শিক্ষকতা একটি মর্যাদাপূর্ণ ভিন্ন পেশা। অন্য পেশাকে আমি মোটেই খাটো করে দেখছি না। তবে আমার সামান্য অভিজ্ঞতা থেকে বলতে পারি শত সমস্যার মাঝেও শিক্ষকতা এমন একটি পেশা যেখানে অপেক্ষাকৃত স্বাধীনভাবে কাজ করা যায়, অপেক্ষাকৃত উৎকণ্ঠাবিহীনভাবে থাকা যায়, অপেক্ষাকৃত কম তাঁবেদারি করে থাকা যায়, অপেক্ষাকৃত স্বচ্ছ বিবেক নিয়ে কাজ করা যায়।

তবে যাই বলি, শিক্ষকতার সার্থকতা-ব্যর্থতা, ভালোলাগা, নালাগা-সবই নির্ভর করে শিক্ষার্থীদের সাথে একজন শিক্ষকের সম্পর্কের ওপর। শিক্ষার্থীদের শ্রদ্ধা ও ভালোবাসার ওপর। আমি প্রশাসন কাডার ছেড়ে এসেছি, আপসোস নেই। যখন দেখি আমার ছাত্র-ছাত্রীরা প্রশাসনসহ বিভিন্ন কাডারে চাকরি করছে, তখন ভাল লাগে, গর্বে বুক ভরে যায়। নিতান্তই ক্ষুদ্র একজন শিক্ষক হিসেবে আমার সকল ক্ষুদ্রতা ঢেকে যায়। ওদের সাফল্যের  মাঝে খুঁজে পাই আমার শিক্ষক জীবনের সার্থকতা।     

শিক্ষকতা একটি বহুমাত্রিক পেশা, এতে কোন সন্দেহ নেই। আমরা শুধু শ্রেণি শিক্ষক নই। দাপ্তরিক, প্রশাসনিক নানা কাজে আমাদের ব্যস্ত থাকতে হয়। শ্রেণিকক্ষের বাইরে আমাদের দক্ষতা প্রমাণ করে আমরা প্রজাতন্ত্রের কর্মকর্তা হিসেবে অন্যান্য কাডারের সবরকম সুযোগ-সুবিধা আমাদের প্রাপ্য। তবে এসব  সুযোগ-সুবিধা থেকে বঞ্চিত হওয়ার ক্ষেত্রে আমদের অবদান নেহায়েত কম নয়।     

সর্বোপরি একথা মানতেই হবে শিক্ষকতা একটি ভিন্ন পেশা। যোগ-বিয়োগ, গুণন-ভাগ করে এই পেশায় সবসময় হিসেব মেলানো যাবে না। তাই আমার তরুণ সহকর্মী যাঁরা স্বেচ্ছায় শিক্ষতাকে বেছে নিয়েছেন, তাঁদের উদ্দেশ্যে বলতে চাই হতাশ হলে চলবে না। অনেক প্রাপ্তির হাতছানি উপেক্ষা করে, অনেক সাহসী সিদ্ধান্ত নিয়েই আমরা এই আদর্শিক পেশা বেছে নিয়েছি। আমরা গড্ডলিকা প্রবাহে গা ভাসিয়ে দেই নি। এখানেই আমাদের স্বকীয়তা এবং স্বাতন্ত্র্য। আমরা প্রতিনিয়ত স্রোতের বিপরীতে সাঁতার কেটে যাচ্ছি। এখানেই আমাদের শক্তি এবং সাহসের পরিচয়।   

আরও একটু পুরনো প্যাঁচাল। কবি গুরুর ভাষায়, “সংসারের যাহা-কিছু মহোত্তম, যাহা মহার্ঘতম, তাহা  পুরাতন, তাহা সরল, তাহার মধ্যে গোপন কিছুই নাই”। শুরুর মতো ব্যক্তিগত পুরনো প্যাঁচাল দিয়েই শেষ করতে চাই। এই পেশার প্রাপ্তি অন্যরকম প্রাপ্তি। আমি অধ্যাপক পদে পদোন্নতি পেয়ে নোয়াখালী সরকারি কলেজ থেকে বদলি হয়ে গত ২০১৬ সালের ৬ই অক্টোবর সিলেট সরকারি মহিলা কলেজে যোগদান করি। আমি নোয়াখালী কলেজে ছিলাম আট বছরেরও অধিক সময় ধরে। স্বাভাবিকভাবেই ছাত্র-ছাত্রীদের সাথে একটা বন্ধন গড়ে উঠেছিল, ভালোবাসার বন্ধন। বদলির খবর শোনার পর থেকেই আমার ছাত্র-ছাত্রীরা মন খারাপ করেছিল। আমারও কষ্ট হচ্ছিলো। ওরা কাঁদছিল, কেউ নিরবে, কেউ সরবে ফুপিয়ে ফুপিয়ে আমাকে জড়িয়ে ধরে। আমিও কেঁদেছি। যারা প্রকাশ্যে কাঁদতে আড়ষ্ট বোধ করছিল, তাদের কেউ কেউ চিঠিতে, ফেইসবুকে শ্রদ্ধা আর ভালোবাসা প্রকাশ করেছে। অকৃত্রিম ভালোবাসার এই অকপট বহিঃপ্রকাশ আর কোথায় আছে, কোন চাকরিতে আছে?     

ঠিক একই রকম ভালোবাসায় সিক্ত হয়েছি যখন আমি সিলেট সরকারি মহিলা কলেজ থেকে দ্বিতীয় বারের মতো ২০১৮ সালের ৫ই জুন সিলেট এম. সি. কলেজে যোগদান করি। আমার প্রাক্তন ছাত্র-ছাত্রীদের উচ্ছ্বাস আমাকে আপ্লুত করেছে অনির্বচনীয় আনন্দরসে। বর্তমানে ইংরেজি বিভাগে আট জন সহকর্মী্র মধ্যে চার জন আমার প্রাক্তন ছাত্রছাত্রী। আমি ওদের সাথে কাজ করতে পেরে আনন্দিত এবং গর্বিত। তবে পেশাদারিত্বের নির্মোহ সম্পর্ক অতিক্রম করে বার বার ফিরে আসে গুরু-শিষ্যের শ্রদ্ধা আর  ভালোবাসার বন্ধন।    

পুরনো প্যাঁচাল শেষ করতে চাই ক্যারিয়ার পছন্দের বিষয়ে আরও একটু প্যাঁচাল দিয়ে। এ কথা সত্য  যে, মেধা এবং আগ্রহ থাকলেও ক্যারিয়ার পছন্দ করার স্বাধীনতা আমাদের দেশে অত্যন্ত সীমিত। তবে বিশেষ মুহূর্তে ক্যারিয়ার সম্পর্কিত সিদ্ধান্ত গ্রহণের ইস্যুটি অনেক বড় এবং অনেক সুদূরপ্রসারী প্রভাব বিস্তারকারী। এই সময় মস্তিষ্ক, হৃদয় এবং ভেতর থেকে আসা প্রতিটি সঙ্কেত মনোযোগ দিয়ে না শুনলে পরবর্তীতে অতৃপ্তি এবং হতাশা চাকরি জীবনকে বিষিয়ে তুলতে পারে। তবে আমার ক্ষেত্রে বলতে পারি, “শোকর আলহামদুলিল্লাহ, ভালো আছি”। আপনারাও ভালো থাকুন। সবার কাছে দোয়া প্রার্থী, শিক্ষকতা জীবনের আর একটি বছর শেষ করে যেন বলতে পারি, “শোকর আলহামদুলিল্লাহ, ভালো ছিলাম”।
লেখক : মোঃ শফিউল আলম, অধ্যাপক, ইংরেজি, এমসি কলেজ, সিলেট,

এ/ইউ/এস