০৭ মার্চ ২০২১ ০২:২০ অপরাহ্ন     |    ই-পেপার     |     English
০৭ মার্চ ২০২১   |  ই-পেপার   |   English
ধর্ষণ প্রতিরোধে আমাদের করণীয়
ধর্ষণ প্রতিরোধে আমাদের করণীয়

শামীমা আক্তার তন্দ্রা

ফেব্রুয়ারী ০৩, ২০২১ ১০:০৭ পিএম
প্রতীকী ছবি



সামাজিক আইন ও ধর্মীয় দৃষ্টিকোণ থেকে নারী-পুরুষের যে কেউ জোরপূর্বক যৌনাচারে লিপ্ত হওয়া নিষিদ্ধ। এ ধরনের কর্মে লিপ্ত হওয়ার নাম ধর্ষণ। প্রচলিত আইনে এ ধরনের প্রমাণিত অপরাধের শাস্তি যাবজ্জীবন কারাদণ্ড সর্বশেষ মৃত্যুদণ্ড হওয়ার কথা রয়েছে। মৃত্যুদণ্ডের বিধান বাস্তবায়নের দাবি এখন জরুরি হয়ে পড়েছে। কারণ সমাজের আনাচে কানাচে ধর্ষণের ঘটনা দিন দিন বেড়েই চলেছে। নারীরা নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছে সর্বত্র এমন কি নিজ ঘরেও, সর্বদা সব সময়। শিশু, যুবা, বৃদ্ধা কেউ বাদ যাচ্ছে না এ ধরনের ভয়ানক বিপদ থেকে। ধর্ষণের মতো বিপদ যেন কিছুতেই পিছু ছাড়ছে না আমাদের। যে কোনো পরিস্থিতিতে নিরাপদে থাকার দায়িত্ব প্রথমত ব্যক্তির নিজের। যৌন সহিংসতা, এর নেতিবাচক প্রভাব, শাস্তি এবং করণীয় সম্পর্কে সঠিক তথ্য এবং সচেতনতা প্রাক-কৈশোর ছেলেমেয়েদের থাকা জরুরি, কারণ সচেতনতা মানুষকে আত্মবিশ্বাসী করে। এই বয়সেই পরিবারে এবং স্কুলে ‘লিঙ্গের ভিন্নতা/যৌনতা এবং সম্পর্ক (sex and relationship) বিষয়ে ছেলেমেয়েদের শিক্ষাদান এখন সময়ের দাবি। এতে সুস্থ সম্পর্ক বিষয়ে ধারণা এবং বিপরীত লিঙ্গের প্রতি সম্মান-সহানুভূতি তৈরি হয়। 

যৌন সহিংসতা প্রতিরোধে ব্যক্তির করণীয়সমূহঃ-

প্রথমত, ধর্ষণের ঘটনা ঘটার আশঙ্কা আছে এমন পরিস্থিতি এড়িয়ে চলা। যেমন, অপরিচিত ব্যক্তি, অনিরাপদ নিরিবিলি স্থান। পর্যবেক্ষণের মাধ্যমে পরিচিত-অপরিচিত ব্যক্তির যৌন উদ্দেশ্য সম্পর্কে বুঝতে চেষ্টা করা এবং সে অনুযায়ী নিরাপত্তার ব্যবস্থা নেওয়া। আস্থাশীল বন্ধু তৈরি করা এবং দলে চলাফেরা করার চেষ্টা করা বিশেষ করে সন্ধ্যার পর। বিপজ্জনক পরিস্থিতিতে দ্রুত প্রস্থান করা, দৌড়ানো এবং যত জোরে সম্ভব চিত্কার করে আশপাশের মানুষের দৃষ্টি আকর্ষণ করা। মরিচগুঁড়ো/ঝাঁঝালো স্প্রে, প্রয়োজনীয় আত্মরক্ষামূলক হাতিয়ার সঙ্গে রাখা এবং প্রয়োজনে তা ব্যবহার করা। বিপদে মাথা ঠাণ্ডা রেখে পরিস্থিতি মোকাবিলা করার চেষ্টা করা। যেমন, আক্রান্ত হবার আগেই চাবির গোছা, ব্যাগ বা হাতের কাছে যা আছে তা দিয়ে আক্রমণকারীকে আঘাত করা ।

ধর্ষণ-পরবর্তী করণীয় এবং বিচার

ধর্ষণের শিকার নারীকে সহানুভূতির সঙ্গে সহযোগিতা করা একটা মানবিক দায়িত্ব। কারণ ধর্ষণ নারীর দোষে ঘটে না, বরং ধর্ষক একজন ভয়ংকর অপরাধী। এ সময় যন্ত্রণাদায়ক অভিজ্ঞতার চাপ সহ্য করা অনেকের জন্য কঠিন হতে পারে, যা আত্মহত্যায় প্ররোচিত করতে পারে। জীবন অনেক মূল্যবান, তাছাড়া আত্মহত্যা কখনো সমস্যার সমাধান নয়। ধর্ষণের শিকার নারীর কঠোর নিরাপত্তা এবং গোপনীয়তা নিশ্চিত করা অতি জরুরি। তার পরিচয়মূলক তথ্য কখনোই প্রকাশ করা যাবে না। ধর্ষণ শাস্তিযোগ্য অপরাধ, কিন্তু ভুক্তভোগীর জীবনে ধর্ষণের তাত্ক্ষণিক এবং দীর্ঘমেয়াদি শারীরিক-মানসিক-সামাজিক প্রভাবের তুলনায় প্রচলিত শাস্তির ধরনে পরিবর্তন দরকার মনে করি। উন্নত দেশে অপরাধীদের চলাফেরা নজরদারির জন্য এ ধরনের ডিভাইস ব্যবহার করা হয়। ধর্ষণকারীর জন্য ডিভাইসটিতে বিশেষ শব্দ যুক্ত থাকবে এবং ডিভাইসটি হাতঘড়ির মতো ব্যবহার করতে হবে, যা আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী তালাবদ্ধ করে দেবেন। এ ডিভাইস থেকে সব সময় শব্দটি সৃষ্টি হবে, যাতে নারীরা এ বিশেষ শব্দে সাবধান হয়ে নিরাপদ দূরত্বে থাকতে পারেন। চিহ্নিত অপরাধী হিসেবে সে সমাজে ঘৃণিত হবে।

দেশে শিশু ধর্ষণের পরিমাণ দিনদিন বেড়েই চলেছে। শিশুরা হলো জাতির ভবিষ্যৎ গড়ার মূল হাতিয়ার। কিন্তু প্রতিদিনের খবরের কাগজে শিশু ধর্ষণের মতো ঘৃণিত অপরাধের কথা উঠে আসছে। বেশির ভাগ শিশুই ধর্ষিত হচ্ছে তাদের গৃহশিক্ষক, নিকটাত্মীয় এবং প্রতিবেশীদের দ্বারা। শিশু ধর্ষণ সমাধানে করণীয় হচ্ছে—প্রথমেই যে কাজটি করতে হবে তা হলো, শিশু ধর্ষণের বিরুদ্ধে জনসচেতনতা গড়ে তুলতে হবে। দ্বিতীয়ত, আমাদের সকলের মন-মানসিকতার পরিবর্তন করতে হবে। তৃতীয়ত, এই জঘন্য অপরাধের জন্য কঠিন শাস্তির ব্যবস্থা করতে হবে। আমাদের পার্শ্ববর্তী দেশ ভারতে, শিশু ধর্ষণের সর্বোচ্চ শাস্তি হচ্ছে মৃত্যুদণ্ড। আমাদের দেশেও ১২ বছরের কম বয়সি মেয়েদের ধর্ষণ করলে মৃত্যুদণ্ডের মতো সর্বোচ্চ শাস্তির ব্যবস্থা করতে হবে। তাহলেই শিশু ধর্ষণের মতো জঘন্য অপরাধ হ্রাস পাবে। ইদানীং পত্রিকার পাতা খুললে কিংবা টিভির সংবাদের দিকে দৃষ্টিপাত করলে প্রায়ই চোখে পড়ে ধর্ষণ ও ধর্ষণ-পরবর্তী হত্যাবিষয়ক খবরাখবর। এ সংক্রান্ত খবর পড়তে পড়তে মানুষের মন যেন আজ রীতিমতো বিষিয়ে উঠেছে। ধর্ষণের হাত থেকে প্রাপ্তবয়স্ক মেয়ে, গৃহবধূ, স্কুল-কলেজ-মাদ্রাসা-বিশ্ববিদ্যালয়পড়ুয়া ছাত্রী থেকে শুরু করে চার-পাঁচ বছরের কোমলমতি শিশু পর্যন্ত কেউই রেহাই পাচ্ছে না। আর বিয়ের প্রলোভন দেখিয়েও ধর্ষণ করার ঘটনা তো সমাজে নিত্যনৈমিত্তিক হয়ে পড়েছে এবং অহরহই ঘটে চলেছে। আমাদের সমাজটা পঁচে গিয়েছে। কোথাও কোনো নারী নিরাপদ নয়, নিরাপদ ভাবার দিন অস্তাচলে । গণধর্ষণের হার বেড়েই চলেছে। এর প্রতিকার পেতে হলে সব ধর্ষককে ফাঁসি দিতে হবে। নইলে তাদেরকে চিরতরের জন্য খোঁজা করে দিতে হবে এবং সবার ভেতর সচেতনতা সৃষ্টি করতে হবে।

লেখক : শামীমা আক্তার তন্দ্রা, তরুণ কলামিস্ট ও সাবেক শিক্ষার্থী, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়

 

 

এম/আর