এপ্রিল / ১৮ / ২০২১ ০৩:০২ পূর্বাহ্ন

হাসান মোরশেদ

মার্চ / ১৪ / ২০২১
০৭:৩৮ অপরাহ্ন

আপডেট : মার্চ / ১৪ / ২০২১
০৭:৩৮ অপরাহ্ন


বঙ্গবন্ধুর পররাষ্ট্রনীতি ও কুটনৈতিক সাফল্য

জানুয়ারি ১০, ১৯৭২ এ দেশে ফিরে আসার আগের ঘটনাবহুল দুদিনে সম্ভবতঃ বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান তাঁর রাষ্ট্রগঠনের জন্য প্রয়োজনীয় পদক্ষেপগুলো নিয়ে বিচার বিশ্লেষণ করে অগ্রাধিকার নির্দিষ্ট করেছিলেন।
পররাষ্ট্রীয় ক্ষেত্রে তিনি যথার্থই উপলব্ধি করেছিলেন- স্বাধীন রাষ্ট্র হিসেবে বাংলাদেশের টিকে থাকার জন্য সেই মুহূর্তের সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ ছিল উপমহাদেশের অবস্থান ও আয়তনের প্রেক্ষিতে এবং তিব্বত ও সিকিমের অভিজ্ঞতার আলোকে পূর্ণাঙ্গ সার্বভৌম রাষ্ট্র হিসেবে জাতিসংঘ ও এর সকল সদস্যরাষ্ট্র কর্তৃক বাংলাদেশের স্বীকৃতি আদায় করে নেওয়া।
এ কারণেই দেখা যায় ৮ জানুয়ারি লন্ডনের সংবাদ সম্মেলনে প্রথমেই তিনি এই দাবিটি উত্থাপন করেছেন।
জাতিসংঘ ও এর সকল সদস্যরাষ্ট্র কর্তৃক স্বীকৃতি পাওয়ার জন্য একেবারে প্রাথমিক শর্তই ছিলো বাংলাদেশ থেকে দ্রুততম সময়ে ভারতীয় সৈন্য প্রত্যহার, অন্যদের কাছে প্রমান করা যে মুক্তিযুদ্ধের প্রয়োজনে ভারতীয় সৈন্য এই ভূ-খন্ডে প্রবেশ করলেও সদ্য স্বাধীন বাংলাদেশ ভারতের ‘ক্লায়েন্ট স্টেট’ না। যুদ্ধ পরবর্তী আইনশৃংখলা সহ সব ধরনের ঝুঁকি মোকাবেলার সামর্থ্য তার আছে।
এ কারণেই বঙ্গবন্ধু ১০ জানুয়ারিতেই প্রথম সাক্ষাতে ভারতীয় প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধীর কাছে দাবি জানিয়েছিলেন দ্রুততম সময়ে সৈন্য প্রত্যাহারের। প্রত্যুৎপন্নমতি মিসেস গান্ধী বুঝতে পেরেছিলেন তাঁর অভিপ্রায়, তাই তৎক্ষনাৎ তিনি জানিয়েছিলেন- শেখ মুজিবের আগামী জন্মদিন অর্থ্যাৎ ১৭ মার্চ তারিখের মধ্যে সর্বশেষ ভারতীয় সৈন্য বাংলাদেশ ভূ-খন্ড ত্যাগ করবে। ইন্দিরা কথা রেখেছিলেন, ১২ মার্চ তারিখেই সৈন্য প্রত্যাহার সম্পন্ন হয়।
বিচক্ষন রাজনীতিবিদ ইন্দিরা গান্ধী তার সৈন্য প্রত্যাহার হবার পরই- বাংলাদেশ সরকার কর্তৃক বাংলাদেশ ভ্রমনের আমন্ত্রন রক্ষা করেছিলেন। তিনি এসেছিলেন ১৭ মার্চ, ১৯৭২। দ্রুততম সময়ে মিত্রবাহিনীর সৈন্যদের চলে যাওয়া ছিলো বঙ্গবন্ধুর কুটনৈতিক সামর্থ্যের এক উজ্জ্বল উদাহরন।
এর আগে যুদ্ধচলাকালীন সময়ে ৬ ডিসেম্বর ১৯৭১ এ ভারত বাংলাদেশকে স্বাধীন রাষ্ট্র হিসেবে স্বীকৃতি দিয়েছিলো। বিগত নয়মাস ধরে স্বাধীনতার জন্য যুদ্ধরত রাষ্ট্রটির জন্য এটিই ছিলো প্রথম আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি। যুদ্ধ চলাকালীন সময়ে বাংলাদেশ স্বীকৃতি দাতা অপর রাষ্ট্রটি হলো ভূটান।
শেখ মুজিব ফিরে এসে দায়িত্ব নেওয়ার প্রথম মাসেই প্রতিবেশী বার্মা ও নেপাল সহ সোভিয়েত ব্লকের অনেকগুলো দেশ এবং অস্ট্রেলিয়া ও নিউজিল্যান্ডের স্বীকৃতি লাভ করে বাংলাদেশ।
ফেব্রুয়ারির ৪ তারিখে যুক্তরাজ্যের স্বীকৃতি পাওয়ার পর ফেব্রুয়ারি ও মার্চ মাস জুড়ে ইউরোপের গুরুত্বপূর্ণ দেশগুলো সহ মোট ৩৪ দেশ বাংলাদেশকে স্বীকৃতি দেয়।
৯ জানুয়ারির লন্ডন বৈঠকেই বঙ্গবন্ধু যুক্তরাজ্যের প্রধানমন্ত্রী এডোয়ার্ড হিথকে জানিয়েছিলেন যুক্তরাজ্য ও যুক্তরাষ্ট্রসহ পশ্চিমা বিশ্বের সাথে দ্রুততম সময়ে তিনি সুসম্পর্ক তৈরি করতে চান। হিথ, নিক্সনকে পাঠানো তারবার্তায় ইংগিত দিয়েছিলেন তাঁরা বাংলাদেশকে স্বীকৃতি দিতে যাচ্ছেন এবং যুক্তরাষ্ট্রে ও উচিত তিক্ততা ভুলে বাংলাদেশকে মেনে নেওয়া।
সত্তুর দশকের শুরুর দিকে সেই সময়ে গোটা বিশ্বের প্রায় সবদেশগুলো যুক্তরাষ্ট্রের নেতৃত্বাধীন পুঁজিবাদী ব্লকে অথবা সোভিয়েত নেতৃত্বাধীন সমাজতান্ত্রিক ব্লকে বিভক্ত ছিলো। শীতল যুদ্ধের সেই কালে রাষ্ট্রে রাষ্ট্রে এই বিভক্তি খুবই স্পষ্ট এবং জোরালো ছিলো। আফ্রো-এশিয়ার সদ্য স্বাধীন বেশিরভাগ দেশগুলোই সাম্রাজ্যবাদ বিরোধের জায়গা থেকে এবং সমাজতন্ত্রের প্রতি ঝোঁক থেকে সোভিয়েত ব্লকের দিকে ঝুঁকে ছিলো। বাংলাদেশের মুক্তি সংগ্রামে ভারত সরাসরি সহযোগীতা করে- এক কোটি শরনার্থীকে আশ্রয় এবং মুক্তিযোদ্ধাদের অস্ত্র প্রশিক্ষন দিয়ে। বাংলাদেশের মুক্তি সংগ্রামের পক্ষে ইন্দিরা গান্ধী সারা পৃথিবী জুড়ে তার কুটনৈতিক তৎপরতা চালান এবং একটা পর্যায়ে বাংলাদেশের স্বাধীনতার জন্য মুক্তিবাহিনীর সহযোগী হিসেবে ভারতীয় সেনাবাহিনী ও পাকিস্তানী সেনাদের বিরুদ্ধে সরাসরি যুদ্ধে অবতীর্ণ হয় ।
অপরদিকে পাকিস্তানের সমর্থনে সৌদী ও ইরান সহ মুসলিম বিশ্ব ছাড়াও পৃথিবীর সবথেকে বড় সামরিক শক্তি যুক্তরাষ্ট্র এবং নতুন সুপার পাওয়ার চীন ছিলো, যুক্তরাষ্ট্রের মিত্র দেশ যুক্তরাজ্য এবং পশ্চিম ইউরোপের কোন কোন দেশ ও পরোক্ষভাবে পাকিস্তানের পক্ষেই ছিলো। সোভিয়েত ইউনিয়নকে বেকায়দায় ফেলার জন্য যুক্তরাষ্ট্র তখন মরিয়া ছিলো নতুন সমাজতান্ত্রিক শক্তি চীনের সাথে সম্পর্কোন্নয়নের এবং এ ক্ষেত্রে চীন ও যুক্তরাষ্ট্রের প্রধান যোগাযোগ মাধ্যম ছিলো পাকিস্তান। সে কারন এই দুই শক্তি প্রবলভাবে সম্পৃক্ত ছিলো পাকিস্তানের যুদ্ধজয়ের জন্য।
এরকম কঠিন বাস্তবতায় ও তৎকালীন সময়ে অর্থনৈতিক ও সামরিকভাবে অপেক্ষাকৃত দুর্বল রাষ্ট্র ভারত বাংলাদেশের পক্ষে অবিচল ছিলো মুলতঃ সোভিয়েত ইউনিয়নের সমর্থনে। ভারত নিজের রক্ষাকবচ হিসেবে সোভিয়েতের সাথে একটি চুক্তি ও সম্পাদন করে। ১৯৭১ সালের আগষ্টের ৯ তারিখে দুই দেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রী শরন সিং ও আন্দ্রে গ্রমিকো নিজে নিজ দেশের পক্ষে চুক্তি স্বাক্ষর করেন। এই চুক্তির ফলে নিশ্চিত হয় বাংলাদেশকে সমর্থন ও সহযোগীতার জন্য যদি ভারত অপর কোন দেশ ( পাকিস্তান/ চীন/ যুক্তরাষ্ট্র) দ্বারা আক্রান্ত হয় তাহলে সোভিয়েত ইউনিয়ন তার সর্বশক্তি নিয়ে ভারতের পাশে এসে দাঁড়াবে। এই চুক্তি বাংলাদেশের মুক্তি যুদ্ধকে আরো বেগবান করে। শুধু এই চুক্তি নয়, যুদ্ধের শেষ পর্যায়ে পাকিস্তান-চীন-যুক্তরাষ্ট্রের চক্তান্তে যখন জাতিসংঘে যুদ্ধ বিরতির প্রস্তাব উঠছিলো তখন সোভিয়েত ইউনিয়ন বারবার ভেটো দিয়ে এই প্রস্তাব বাতিল করে দেয়।
অর্থনীতির প্রশ্নে সমাজতান্ত্রিক মডেলের প্রতি দুর্বলতা থাকলেও বঙ্গবন্ধু তাঁর রাজনৈতিক জীবনে কখনোই মার্কসবাদী ছিলেন না । গোটা পাকিস্তান আমলেই আওয়ামী লীগ বারবার জাতীয়করন ও সম্পদের সুষম বন্টনের পক্ষে প্রতিশ্রুতি ব্যক্ত করলেও বঙ্গবন্ধুর আওয়ামী লীগ কখনো কমিউনিষ্ট পার্টি হয়ে উঠেনি। ১৯৪৯ এর প্রতিষ্ঠাকালীন সময় থেকে নানা ঘাত প্রতিঘাত এর মধ্য দিয়ে আওয়ামী লীগ হয়ে উঠেছিলো ডান ও বামের সমন্বয়ে গড়ে উঠা মধ্যপন্থী জাতীয়তাবাদী দল। ছয়দফাকে কেন্দ্র করে তীব্র বাঙ্গালী জাতীয়তাবাদী স্বাধিকার আন্দোলনের মাধ্যমে বঙ্গবন্ধু নিজেকে তাঁর দলের বাম ও ডানপন্থীদের মধ্যকার ‘ব্যালেন্স ফ্যাক্টর’ হিসেবে অধিষ্ঠিত করেন। তিনি তাঁর চৌকস নেতৃত্বে তাজউদ্দীন আহমদের মতো বামপন্থী আদর্শবাদী এবং খন্দকার মোশতাক এর মতো ডানপন্থী প্রাচীন ধারার নেতাকেও বাঙ্গালী জাতীয়তাবাদের একক ধারায় সন্নিহিত করেন। তাঁর অনুপস্থিতিতে মুক্তিযুদ্ধ চলাকালীন সময়ে এই দুই বিপরীত পন্থী নেতৃত্বের প্রকাশ্য দ্বন্ধ, বঙ্গবন্ধুর অপরিহার্যতাই আরো বেশী করে স্পষ্ট করেছিলো। জানুয়ারি ৩ তারিখে স্টেট ডিপার্টমেন্ট এ পাঠানো সিআইএ’র রিপোর্ট ও সেই ধারনাকে সমর্থন করে।
মুক্তিযুদ্ধে ভারত ও সোভিয়েত ইউনিয়নের অসামান্য অবদানের জন্য অশেষ কৃতজ্ঞতার পরও বঙ্গবন্ধু নিশ্চিতভাবেই চাচ্ছিলেন না তাঁর সদ্য স্বাধীন দেশ আন্তর্জাতিক শক্তিগুলোর ক্ষমতা দ্বন্ধে র টেবিল হয়ে উঠুক। এই না চাওয়ার পেছনে দুটো কারন ক্রিয়াশীল ছিলো বলে ধারনা করা যায়। প্রথমতঃ তিনি বাংলাদেশকে আন্তর্জাতিক রাজনীতির প্রেক্ষাপটে জোট নিরপেক্ষ অবস্থানে রাখতে চেয়েছিলেন। দ্বিতীয়তঃ তিনি অনুধাবন করছিলেন- যুদ্ধে সম্পূর্ণভাবে বিধ্বস্ত এই অতি ক্ষুদ্র রাষ্ট্রের বিশাল জনগোষ্ঠির খাদ্য সহযোগীতা সহ পুণর্গঠনের জন্য পশ্চিমা বিশ্বের সহযোগীতা ছাড়া কোন বিকল্প নেই। ভারত নিজেই তখন খাদ্য ঘাটতির দেশ, সোভিয়েতের পক্ষে সামরিক ও অবকাঠামোগত উন্নয়নে সমর্থন দেওয়া সম্ভব হলেও খাদ্য সহ আর্থিক সহযোগীতা সম্ভব ছিলোনা।
৭২ এর জানুয়ারি মাসের বাস্তবতায় তাঁর সামনে সবচেয়ে জরুরি অগ্রাধিকার দেশের ক্ষুধার্ত মানুষের অন্ন সংস্থান। আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলো অগ্রীম সতর্কতা জারী করেছে- দুর্ভিক্ষ আসছে, ৫ লক্ষ মানুষের প্রানহানী ঘটবে। যুদ্ধের আগে থেকেই পূর্ব পাকিস্তানে খাদ্য ঘাটতি ছিলো আর যুদ্ধের কারণে সর্বস্বান্ত, কৃষি উৎপাদন নেই বললেই চলে, রিজার্ভ শূন্য- পাকিস্তানীরা চলে যাওয়ার সময় পুড়িয়ে দিয়ে গেছে সমস্ত ব্যাংক নোট, খাদ্য কেনার টাকা নাই, কোনভাবে খাদ্য পাওয়ার ব্যবস্থা করা গেলেও বন্দরে আনার জাহাজ নাই- প্রধান বন্দর চট্টগ্রাম তখনো ব্যবহার অযোগ্য, পাকিস্তানীরা জাহাজ ডুবিয়ে গেছে, মাইন পুঁতে রেখেছ বন্দরের চ্যানেলে। খাদ্য শস্য সরবরাহ করার জন্য আভ্যন্তরীন যোগাযোগ বিপর্যন্ত- ব্রীজ, কালভার্ট, রেলপথ, সড়ক পথ ধ্বংস, এমনকি ট্রাক পর্যন্ত নেই। এক কোটি শরনার্থী ফিরে আসছে সহায় সম্বলহীন অবস্থায়- তাদের মাথা গোঁজার ঠাঁই নাই। রাষ্ট্র পরিচালনা, আইন শৃঙ্খলা পরিস্থিতি ও আভ্যন্তরীন সরবরাহ নিশ্চিত করার মতো কোন প্রশাসন নাই তখনো। এ অবস্থায় ইতিহাসের অন্যতম গণহত্যার শিকার এই জনপদে ভয়ংকর দুর্ভিক্ষ ঘটে যাওয়া বিচিত্র ছিলো না মোটেও।
এরকম অবস্থা সামনে রেখে বঙ্গবন্ধু সিদ্ধান্ত নেন ভারত-সোভিয়েতের সাথে সুসম্পর্ক রেখেও তিনি জোট নিরপেক্ষ থাকবেন এবং পৃথিবীর সবথেকে বেশী খাদ্য উৎপাদনকারী দেশ যুক্তরাষ্ট্রের সাথে অগ্রাধিকার ভিত্তিতে সুসম্পর্ক স্থাপন করবেন। যুক্তরাষ্ট্র ছাড়াও পাকিস্তানের সাথে সম্পর্ক স্থাপনেও তিনি আগ্রহী হন। মুক্তিযুদ্ধ চলাকালীন সময়ে প্রায় আড়াই লক্ষ বিহারী সম্প্রদায় পাকিস্তানী গনহত্যার দোসর হয় কিন্তু যুদ্ধের পর পাকিস্তান এদের ফিরিয়ে নিতে টালবাহানা করে। বাংলাদেশ ও ভারতের হাতে ৯৩০০০ হাজার পাকিস্তানী যুদ্ধবন্দী থাকলেও পাকিস্তানে তখন আটক চার লক্ষ বাংলাদেশী- সামরিক বাহিনী সদস্য, সরকারী কর্মচারী সহ পেশাজীবি মানুষ, নতুন রাষ্ট্রের জন্য যাদের প্রয়োজন ছিলো। এ ছাড়া যুদ্ধ পরবর্তী সময়ের সম্পদ বন্টন নিয়েও পাকিস্তানের সাথে দরকষাকষি ছিলো। এসব কিছুর জন্য পাকিস্তানের স্বীকৃতি জরুরি ছিলো। এ ছাড়া পাকিস্তানের সাথে সম্পর্ক স্থাপনের মাধ্যমে চীনকে নিস্ক্রিয় করাও আবশ্যক ছিলো তখন। নিরাপত্তা পরিষদের সদস্য হিসেবে চীনের ভেটো দানের ক্ষমতা ছিলো, বাংলাদেশের জাতিসংঘে অন্তর্ভুক্তির আবেদনে ভেটো দিয়ে বানচাল করে দেওয়ার আশংকা ছিলো।
২১ আগষ্ট ১৯৭২ বাংলাদেশের জাতিসংঘে সদস্যপদ প্রদানের বিষয়টি আলোচনা করার জন্য নিরাপত্তা পরিষদে বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। ২৫ শে আগষ্ট জাতিসংঘে বাংলাদেশের সদস্যপদের বিষয়ে নিস্পত্তির জন্য নিরাপত্তা পরিষদের সদস্যরা আবার বৈঠকে বসেন। নিরাপত্তা পরিষদের সংখ্যাগরিষ্ঠভোটে জাতিসংঘে বাংলাদেশের অন্তর্ভুক্তি প্রস্তাব পাস হয় কিন্তু চীন এতে ভেটো প্রদান করে এবং স্থায়ী পরিষদের সদস্য হিসেবে চীনের ভেটোর কারণে বাংলাদেশের জাতিসংঘে অন্তর্ভুক্তি আটকে যায়। পরবর্তিতে ‘৭৪ এ পাকিস্তানের স্বীকৃতি আদায়ের পর পুনঃ আবেদন করলে চীন নিরব থাকে]
১৬ ডিসেম্বর ১৯৭১ পর্যন্ত পাকিস্তানকে সবধরনের সমর্থন জোগালেও, সদ্য স্বাধীন বাংলাদেশে যুক্তরাষ্ট্র তার কনস্যুলার অফিস চালু রাখে হার্বার্ট ডি স্পিভাক এর নেতৃত্বে। স্পিভাক স্টেট ডিপার্টমেন্টকে বুঝাতে চেষ্টা করেন কেনো বাংলাদেশকে দ্রুত স্বীকৃতি দেওয়া দরকার। স্পিভাক এর মতামত ছিলো- আয়তনে ছোট হলেও জনসংখ্যার ভিত্তিতে পৃথিবীর অষ্টম এই দেশটি ভূ-রাজনৈতিক কারণে গুরুত্বপূর্ণ। যুদ্ধে সহযোগীতা করে ভারত ও সোভিয়েত ইউনিয়ন ইতিমধ্যেই এখানে তাদের অবস্থান তৈরি করে ফেলেছে। সংখ্যায় সামান্য হলেও চীনপন্থী রাজনৈতিক কর্মী আছে এখানে, সরকারকে এড়িয়ে চীন এদের সাহায্যে এখানে প্রভাব বিস্তারের চেষ্টা করবে। যুক্তরাষ্ট্রের উচিত বাংলাদেশ সম্পূর্ণভাবে ভারত-সোভিয়েত ব্লকে ঝুঁকে পড়ার আগেই, সুসম্পর্ক গড়ে তোলা।
কিন্তু ঢাকা কনস্যুলারের সমস্ত আবেদনের পর ও ওয়াশিংটন সময় ক্ষেপন করতে থাকে। ২ ফেব্রুয়ারি প্রেসিডেন্ট নিক্সন ও তার উপদেষ্টা কিসিঞ্জার এর টেলিফোণ আলাপ থেকে জানা যায়, কিসিঞ্জার পরামর্শ দিচ্ছিলেন আসন্ন বেইজিং সফরে চৌ এন লাই এর সাথে আলাপ না করে বাংলাদেশকে স্বীকৃতি দেওয়া ঠিক হবেনা।
ঢাকা কনস্যুলার অফিসের আন্তরিকতা স্বত্বেও ওয়াশিংটনের অস্পষ্টতা বঙ্গবন্ধুকে কৌশল পাল্টাতে বাধ্য করে।
মার্চের আসন্ন সোভিয়েত সফরকে সামনে রেখে, তাঁর নির্দেশে মার্কিন কনস্যুলার হার্বার্ড স্পিভাককে বাংলাদেশের পররাষ্ট্র মন্ত্রনালয়ে ডেকে পাঠানো হয়। তার কাছে বাংলাদেশকে স্বীকৃতির বিষয়ে ওয়াশিংটনের অবস্থান জানতে চান। চাপ সৃষ্টি করার কৌশল হিসেবে বলা হয়- মস্কো সফরের আগেই যেনো ওয়াশিংটন এ বিষয়ে ঢাকাকে তার মতামত জানায় কারন বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতি নির্ধারনের জন্য এটি জরুরি। স্পিভাককে বলা হয়, অনির্দিষ্টকাল ধরে বাংলাদেশ তার সীমানায় যুক্তরাষ্ট্রের কনস্যুলার পর্যায়ের কার্যক্রম চালাতে দিতে পারেনা। স্বীকৃতির বিষয়ে ওয়াশিংটন দ্রুত তাদের সিদ্ধান্ত না জানালে বাংলাদেশ, মার্কিন কনস্যুল অফিস বন্ধ করে দিতে বাধ্য হবে।
৪ এপ্রিল ১৯৭২, ওয়াশিংটনে সাংবাদিক সম্মেলনে উইলিয়াম রজার্স আনুষ্ঠানিকভাবে বাংলাদেশকে যুক্তরাষ্ট্রের স্বীকৃতির ঘোষনা পাঠ করেন।
এর মাধ্যমে বহুল প্রতিক্ষিত বাংলা-মার্কিন কূটনৈতিক সম্পর্ক আনুষ্ঠানিক স্বীকৃতি লাভ করে। এই সম্পর্ক স্থাপনের মাধ্যমে বঙ্গবন্ধু শুধু মাত্র তাঁর নতুন রাষ্ট্রের পুনর্বাসন ও পুর্নগঠনের ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ মাত্রা যোগ করলেন না বরং এই অঞ্চলকে ঘিরে দুই পরাশক্তির উত্তেজনা প্রশমন করলেন খুব দক্ষ কুটনৈতিক প্রজ্ঞায়।
গণহত্যার অপরাধে পাকিস্তানী সামরিক অফিসারদের বিচারের বিষয়ে বঙ্গবন্ধু ছিলেন বদ্ধপরিকর। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের দুতিয়ালীতেও তিনি যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের প্রতিজ্ঞা থেকে সরে আসেননি। কিন্তু পাকিস্তানে আটক ৪ লক্ষ বাঙ্গালীকে ফিরিয়ে আনার প্রয়োজনে তাঁকে শেষ পর্যন্ত নমনীয় হতে হয়। ভারতের মধ্যস্থতায় পাকিস্তান প্রতিশ্রুতি দেয় ১৯৫ জন সামরিক অফিসারকে তারা বিচারের কাঠগড়ায় দাঁড় করাবে। বলাবাহুল্য পাকিস্তান সে কথা রাখেনি। পাকিস্তানী যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের প্রক্রিয়া থেকে সরে আসলেও বাংলাদেশ পাকিস্তানে আটকে পড়া ৪ লক্ষ বাঙ্গালীর প্রত্যেককে বাংলাদেশে ফিরিয়ে আনতে সক্ষম হয়। কিন্তু পাকিস্তানের স্বীকৃতি এবং জাতিসংঘে অন্তর্ভুক্তির গুরুত্বপূর্ণ অর্জন তখনো বাকী।
১৯৭৪ সালের ফেব্রুয়ারি মাসের তৃতীয় সপ্তাহে অনুষ্ঠিতব্য ওআইসি সম্মেলনকে ঘিরে বাংলাদেশ ও পাকিস্তানের কুটনৈতিক দ্বৈরথ আবারো মাথাচাড়া দিয়ে উঠে। ইতিমধ্যে বাংলাদেশকে স্বীকৃতি দেওয়া গুরুত্বপুর্ণ মুসলিম রাষ্ট্রগুলো- আলজেরিয়া, মিশর, কুয়েত, জর্ডান, ইন্দোনেশিয়া, মালয়েশিয়ার রাষ্ট্রপ্রধানরা বঙ্গবন্ধুকে বার বার অনুরোধ করতে থাকেন এই সম্মেলনে যোগ দেওয়ার জন্য। কিন্তু তিনি আবারো তাঁর পুরনো শর্ত আরোপ করে জানান- যদিও বাংলাদেশ ধর্মনিরপেক্ষ রাষ্ট্র, তবু পৃথিবীর দ্বিতীয় মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ রাষ্ট্রের প্রধান হিসেবে ইসলামী রাষ্ট্র সমুহের শীর্ষ সম্মেলনে যোগ দিতে আপত্তি নাই কিন্তু এর আগে বাংলাদেশকে পাকিস্তানের স্বীকৃতি দিতে হবে। মুসলিম রাষ্ট্র সমুহের নেতৃবৃন্দও ভুট্টোর উপর চাপ প্রয়োগ করেন।
শেষ পর্যন্ত ১৯৭৪ সালের ২২ ফেব্রুয়ারি, সম্মেলন শুরু হবার দিন পাকিস্তান আনুষ্ঠানিক ভাবে বাংলাদেশকে একটি স্বাধীন ও সার্বভৌম রাষ্ট্র হিসেবে স্বীকৃতি দেয়। এই স্বীকৃতি শুধু কুটনৈতিক কারণেই গুরুত্বপূর্ণ ছিলো না, নৈতিক ও আদর্শিক ভাবেও পাকিস্তানের বিরুদ্ধে বাংলাদেশের জয়ের স্বীকৃতি ছিলো এটি। এর আগে ১৬ ডিসেম্বর ১৯৭১ এর পরাজয়ের পর ও পাকিস্তান তার সংবিধানে বাংলাদেশকে পূর্ব পাকিস্তান হিসেবে তার অংশ বলে দাবি করছিলো।
এরপর ১৮ সেপ্টেম্বর তারিখে জাতিসংঘের সাধারন পরিষদের সর্বসম্মত অনুমোদনে বাংলাদেশ জাতিসংঘের সদস্য পদ লাভ করে, চীন এবার আর ভেটো দেয়নি। এর মাধ্যমে বঙ্গবন্ধু সরকারের দীর্ঘ আড়াই বছরের কুটনীতির চুড়ান্ত অর্জন সম্পন্ন হয়। কিন্তু বাংলাদেশের আভ্যন্তরীন পরিস্থিতি তখন মোটে ও সুখকর নয় তখন, ভয়াবহ বন্যাজনিত দুর্ভিক্ষাবস্থা দেশ জুড়ে।
তবু এ অবস্থায় বঙ্গবন্ধুকে নিউইয়র্ক যেতে হয় সাধারন পরিষদের অধিবেশনে যোগ দেওয়ার জন্য। ২৫ সেপ্টেম্বর তারিখে তিনি জাতিসংঘে তাঁর ঐতিহাসিক বাংলা বক্তৃতা দেন উল্লাসমুখর প্রতিনিধিবর্গের তুমুল করতালির মধ্যে । এর আগে কেউ পৃথিবীর এই অষ্টম জনব্যবহৃত ভাষায় কথা বলেননি রাষ্ট্রসমুহের এই সংঘে।
১৯৭৫ এর পনেরো আগষ্ট নির্মমভাবে নিহত হবার আগ পর্যন্ত তাঁর শাসনামলের মাত্র সাড়ে তিনবছর সময়ে মুজিব ১১০ টি দেশের স্বীকৃতি এবং জাতিসংঘ সহ ২৭টি আন্তর্জাতিক সংস্থার সদস্য পদ অর্জন করিয়ে স্বাধীন সার্বভৌম বাংলাদেশ রাষ্ট্রটিকে নিজের পায়ে দাঁড় হবার ভিত্তিটুকু তৈরি করে দিয়ে গেছেন। একজন পিতা তাঁর সন্তানের ভবিষ্যতের জন্য যে ভিত্তি গেঁথে দেয়, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান স্বল্পকালীন শাসনামলে বাংলাদেশের জন্য তাই করে গিয়েছেন।

মুক্ত চিন্তা