এপ্রিল / ১৮ / ২০২১ ০১:৩৫ পূর্বাহ্ন

উজ্জ্বল মেহেদী

মার্চ / ২২ / ২০২১
০৪:১৩ পূর্বাহ্ন

আপডেট : মার্চ / ২২ / ২০২১
০৪:১৩ পূর্বাহ্ন


একদিনের বইমেলা ও পুলিশের এক কর্তার 'জ্বালা'

প্রশ্ন : কে আপনি?
উত্তর : আমি প্রথম আলোর একজন কর্মী।
ভিজিটিং কার্ড বাড়িয়ে দিতেই জেরা, 'আপনি সাংবাদিক! পড়াশোনা কতদূর? জার্নালিজম পড়ে সাংবাদিক হয়েছেন কি?'
এমন জেরা আমাদের আলোকচিত্রী আনিস মাহমুদকে ঘিরে। একসঙ্গে এত প্রশ্ন, কোনটার জবাব দেবে সে? সঙ্গে ছিল বইমেলার আয়োজক দলের প্রধান, প্রথম আলো বন্ধুসভার একজন নারী সদস্য। যিনি ডেকেছিলেন, তিনি এসএমপির একজন কর্তা। জনারণ্যে কোনো অনুষ্ঠান করার আগে পুলিশের নিরাপত্তা চাইতে গেলে তাঁর দপ্তরের মুখোমুখি হতে হয়। ওই দপ্তরের 'ইমাম' বলা যায় তাঁকে।
সিলেট কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে এই নিয়ে সাত বছর ধরে বইমেলা হচ্ছে। সিলেট সিটি করপোরেশনের সহায়তায় চলে বইমেলা।

এবার করোনা পরিস্থিতির কারণে সংকুচিত করা হয় আয়োজন। এক দিনব্যাপী ছিল। যথারীতি সিসিকের অনুমতি ও সহআয়োজকের বিষয়টি উল্লেখ করে এসএমপির দপ্তরকে লিখিতভাবে অবহিত করা হয়। লিখিতভাবে জানানোর একটি অনুলিপি সংগ্রহে রাখা হয়। ১৯ মার্চ বইমেলার আগের দিন সন্ধ্যায় 'ইমাম' তাঁর দপ্তরে ডাকলেন আয়োজনটির নেতৃত্ব দেওয়া নারী সদস্যকে। সন্ধ্যাবেলায় একা যাবেন কি করে-এ জন্য সঙ্গে ছিলেন আনিস মাহমুদ। একজনকে ডাকতে গিয়ে আনিস মাহমুদ কেন সঙ্গে গেলেন, সেটিই ছিল চটে যাওয়ার মূল কারণ।

বইমেলা বেলা ১১টা থেকে রাত ১০টা পর্যন্ত হয়। বন্ধুসভার নিজস্ব নিরাপত্তায় কোনো অঘটন ঘটেনি। সুন্দরভাবে শেষ হয়েছে। কিন্তু বইমেলা ও জনগুরুত্বপূর্ণ স্থান হওয়ায় আমরা পুলিশ চেয়েছিলাম। কেননা, বইমেলাতেই আক্রান্ত হয়েছিলেন হুমায়ূন আজাদ। মুক্তমনা অভিজিৎ অতর্কিত হামলার মুখে পড়ে চিরবিদায় নিয়েছেন। এসব শংকা থেকে প্রতি বছর বইমেলার আগে সতর্কতায় ঠিক এভাবেই পত্র মারফত পুলিশের নিরাপত্তা পাওয়া যায়। নির্বিঘ্ন হয় বইমেলা। এবার সেই সহযোগিতা মিলল না।

এবার কেন মিলল না? কেন আমাদের আলোকচিত্রী আনিস মাহমুদের সঙ্গে এমন রূঢ় আচরণ? এসএমপির সেই দপ্তরের 'ইমাম' কি কোনো কারণে আনিস মাহমুদ দ্বারা অসন্তুষ্ট? এসব প্রশ্নে মেলার পর এক ধরনের ‌‌'জ্বালা'য় পুড়ছে মন। যেদিন ঘটনা, সেদিনই ঘটনাটি সর্বোচ্চ কর্মকর্তাকে শুধু অবহিত করা হয়েছে। এর বাইরে তো আর কিছু করার নেই আমাদের।

বইমেলা শেষ। কিন্তু রেশটা রয়ে গেছে। আনিস মাহমুদের ওপর যদি কোনো একজনের অসস্তুষ্টি থাকে, তাহলে সেটা কী? কোনো উত্তর পাইনি। আনিস মাহমুদের ফটোচিত্রে এক দুঃসময়ে ভরসা পাওয়ার একাধিক ঘটনায় একটি স্বীকৃতি দিয়েছিল এসএমপি। সেই স্বীকৃতি ফিরিয়ে দিতে প্রস্তুত আনিস।

প্রথম আলোয় সংবাদচিত্রে অনেক সাফল্য আছে আনিসের। এরমধ্যে কিছু ঘটনা আছে ফটোসাংবাদিকতার বাইরে মানবিক ও সাহসিকতার। যুদ্ধাপরাধীদের বিচার প্রক্রিয়া চলার সময় পুলিশ যখন একের পর এক আক্রান্ত হচ্ছিল, তখন পুলিশ আক্রান্ত হওয়ার স্থান থেকে সহকর্মী পুলিশকে ফেলে অন্য পুলিশদের পলায়নের অনেক ঘটনা আছে আনিসের ক্যামেরায়। সবগুলো ঘটনা দেখতে দেখতে শেষে ফটোসাংবাদিকদের ত্রাতার স্বীকৃতি দিয়েছিল এসএমপি। আনিস মাহমুদ ছিলেন সেই দলের অন্যতম একজন। তবে সেইসব স্বীকৃতির চেয়ে আনিসের বড় প্রাপ্তি ছিল, আক্রান্ত পুলিশ সদস্যরা সুস্থ হয়ে আনিসকে করুণভাবে বলেছেন, 'সঙ্গে থাকা পুলিশ তো আগেই পালাইছিল, আপনি না গেলে মারা যাইতাম। ক্যামেরা দেখে হামলাকারীরা রেহাই দিছে!'

যাক, নিজেদের কথা বাদ দিই। এবার ভাবি জনগণের কথা। ওয়েবসাইটেই আছে SMP Ordinance। এটি 'সিলেট মহানগরী পুলিশ আইন, ২০০৯' নামে অভিহিত। একটু চোখ রাখি তাতে। বলা আছে ‘সিলেট মহানগরী এলাকার জন্য একটি স্বতন্ত্র পুলিশ বাহিনী গঠন ও ইহার নিয়ন্ত্রণের লক্ষ্যে প্রণীত আইন’। পুলিশ জনবান্ধব বাহিনী, তাই সবখানেই আছে জনস্বার্থ। নিরাপত্তা চাওয়া মাত্র যথাযথ আইনি পদক্ষেপ নেওয়ার বিষয়টি পরতে পরতে আছে। জনগণের প্রতি কর্তব্য পালন করতে গিয়ে পুলিশের আচরণ কেমন হবে, তারও বিশদ বর্ণনা আছে। অনুচ্ছেদের ১৬ নম্বরে ‌'প্রত্যেক পুলিশ কর্মকর্তার দায়িত্ব হইবে'–তে 'দু্র্ব্যবহার পরিহার করা এবং বিরক্তিকর আচরণের কারণ না হওয়া' স্পষ্ট করা। 'ঙ' নম্বর ক্রমে বলা হয়, 'মহিলা ও শিশুদের সহিত ব্যবহারের সময় শালীনতাপূর্ণ আচরণ কঠোরভাবে মানিয়া চলা এবং যুক্তিসংগত ভদ্র ব্যবহার করা।'

আছে প্রকাশ্যে অশালীন ব্যবহারের দণ্ড। ৭৮ নম্বরে উল্লেখ আছে 'কোন ব্যক্তি রাস্তায় বা জনসাধারণের ব্যবহার্য প্রকাশ্য স্থানে, অথবা রাস্তা বা অনুরূপ স্থান হইতে দেখা যায়, এইরূপ জায়গায় বা কোন স্টেশনে বা লোক অবতরণ স্থানে অথবা অফিসে বা গৃহাভ্যন্তরে বা ঘরের বাহিরে ইচ্ছাকৃতভাবে ও অশালীনভাবে নিজের দেহ প্রদর্শন করিলে অথবা অশালীন ভাষা ব্যবহার করিলে অথবা অশালীন বা মারমুখী আচরণ করিলে, তিনি তিন মাস পর্যন্ত কারাদণ্ডে অথবা পাঁচশত টাকা পর্যন্ত অর্থদণ্ডে অথবা উভয় দণ্ডে দণ্ডনীয় হইবেন৷'
৭৯ নম্বরে উল্লেখ আছে 'মহিলাদের উত্যক্ত করার দণ্ড'। তাতে বলা হয়েছে, 'কোন ব্যক্তি কোন রাস্তা বা সর্বসাধারণের ব্যবহার্য স্থানে অথবা গৃহভ্যন্তরে বা ঘরের বাহিরে মহিলাকে দেখাইয়া বা দেখাইবার উদ্দেশ্যে নিজের অংগ প্রত্যংগ প্রদর্শন করিলে অথবা রাস্তায় বা সর্বসাধারণের ব্যবহার্য প্রকাশ্য স্থানে ইচ্ছাকৃত ভাবে কোন মহিলার পথ রোধ করিলে বা তাহার শরীরের কোন স্থানে স্পর্শ করিলে, অথবা অশালীন বাক্য বা শব্দ বা মন্তব্য করিয়া বা অংগভংগী করিয়া তাহাকে উত্যক্ত করিলে তিনি এক বৎসর পর্যন্ত কারাদণ্ডে অথবা দুই হাজার টাকা পর্যন্ত অর্থদণ্ডে অথবা উভয় দণ্ডে দণ্ডনীয় হইবেন।'

বইমেলার মতো সৃজনশীল অনুষ্ঠানের নিরাপত্তায় পুলিশ চাইতে গিয়ে জনগণ মানে আমাদের একজন কর্মী ও বন্ধুসভার এক নারী সদস্যকে ডেকে নিয়ে যে আচরণ, তা এসএমপি প্রণীত আইনের সঙ্গে সঙ্গতিপূর্ণ কি?  এই দণ্ডকারণ্য তাহলে কার জন্যে?

মুক্ত চিন্তা