জুলাই / ২৯ / ২০২১ ০৯:৪১ অপরাহ্ন

শাহিদ হাতিমী স্টাফ রিপোর্টার

জুন / ১৬ / ২০২১
১০:০০ অপরাহ্ন

আপডেট : জুলাই / ২৯ / ২০২১
০৯:৪১ অপরাহ্ন

পুলিশের কাছে গোয়াইনঘাটের ট্রিপল হত্যাকান্ডের দু‘টি কারণ

সন্দেহের তীর হিফজুরের দিকে



203

Shares

গোয়াইনঘাটে ঘটে গেছে লোমহর্ষক এক হত্যাকান্ড। দিনমজুর ও নিরিহ একটি পরিবারে এমন চাঞ্চল্যকর ঘটনায় সবার বিবেকে নাড়া দিয়েছে। উল্লেখ করার মতো নিজের কোনা সম্পদ নেই যে ঘরে, সে ঘরে ডাকাত আসার সম্ভাবনাও নেই। একেবারেই দরিদ্রভাবে স্ত্রী আর দুই সন্তান নিয়ে মামার বাড়িতে থাকতো দিনমজুর হিফজুরের পরিবার। কে জানতো এই ভাঙা ঘরেই মঙ্গলবার রাতের কোনো এক সময় অথবা বুধবার ভোরে ঢুকে পড়ে আঁতাতায়ী ঘাতকরা সব শেষ করে দেবে হিফজুরের? গোয়াইনঘাটেi একই পরিবারের দুই শিশুসহ মায়ের গলাকাটা লাশ উদ্ধার করেছে পুলিশ। এ নিয়ে গোয়াইনঘাটসহ পুরো সিলেটজোড়ে উদ্বেগ ও চাঞ্চল্য বিরাজ করছে। সিলেটের পুলিশ সুপারসহ প্রশাসনের উর্ধতন কর্মকর্তা ও গোয়েন্দারা ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেছেন। ঘটনাস্থল থেকে মারাত্মক আহত ও অজ্ঞান অবস্থায় নিহতের স্বামী হিফজুর রহমানকে (৩৮) উদ্ধার করা হয়েছে। জানা গেছে, মঙ্গলবার দিবাগত রাতে লোমহর্ষক এ হত্যাকান্ড ঘটেছে। 

বুধবার (১৬ জুন, ২০২১) সকাল সাড়ে ৭টার দিকে বিষয়টি জানাজানি হয়েছে। সিলেট জেলার গোয়াইনঘাট উপজেলার ৬নং ফতেহপুর ইউনিয়নের বিন্নাকান্দি দক্ষিণপাড়া গ্রামে এ রহস্যজনক ঘটনাটি ঘটে। এতে নিহতরা হলেন- আলিমা বেগম (৩৫) আট বছরের ছেলে মিজানুর রহমান ও তিন বছরের শিশুকন্যা তানিশা বেগম। এ সময় গুরুতর আহত অবস্থায় নিহত আলেমার স্বামী হিফজুর রহমানকে (৩৮) অজ্ঞান অবস্থায় উদ্ধার করে পুলিশ। এরপর হিফজুর রহমানকে সিলেট এমএজি ওসমানী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের চিকিৎসার জন্য ভর্তি করা হয়। বুধবার বিকেলে হিফজুরের জ্ঞান ফিরলেও তিনি স্বাভাবিকভাবে কথা বলার অবস্থায় ছিলেন না, তাই জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়নি। তিনি এখন পুলিশ হেফাজতে ওসমানী হাসপাতালে চিকিৎসাধীন। তবে তার অবস্থা শঙ্কামুক্ত বলে জানা গেছে।

স্থানীয়রা জানান, বুধবার (১৬ জুন) সকালে অনেক বেলা পর্যন্ত হিফজুরের ঘরের কেউ ঘুম থেকে উঠছিলেন না দেখে প্রতিবেশীরা হিফজুরের ঘরের সামনে যান। এসময় ভেতর থেকে কান্নার শব্দ শুনে দরজায় ধাক্কা দেন তারা। তখন হিফজুর রহমানের ঘরের ভেতর থেকে গোঙানির শব্দ পান। ডাকাডাকি করা হলেও কেউ সাড়া দিচ্ছিলেন না। এসময় দরজার সিটকিনি খোলা দেখতে পেয়ে তারা ভেতরে প্রবেশ করে খাটের মধ্যে তিন জনের জবাই করা মরদেহ ও হিফজুরকে রক্তাক্ত অবস্থায় পড়ে থাকতে দেখেন। নিতর দেহগুলোর ঘাড়ে ও মাথাসহ শরীরের বিভিন্ন স্থানে ধারালো অস্ত্র দিয়ে কোপানোর চিহ্নও দেখতে পান প্রতিবেশিরা। পরে গোয়াইনঘাট থানায় খবর দিলে একদল পুলিশ গিয়ে লাশ তিনটি উদ্ধার করে ও হিফজুরকে হাসপাতালে পাঠায়। হিফজুরের শরীরেও বিভিন্ন স্থানে দায়ের কোপ ও জখম ছিল।

এ বিষয়ে গোয়াইনঘাট থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) আবদুল আহাদ দৈনিক জৈন্তা বার্তাকে জানান, ডিআইজি ও জেলা পুলিশ সুপার ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেছেন। তাদের নির্দেশনায় ক্লু বের করার কাজ করা হচ্ছে। এক প্রশ্নের জবাবে ওসি বলেন, ‘যে বটি দিয়ে কুপিয়ে হত্যা করা হয়েছে সেই বটি নিহতদের ঘরেরই। এ থেকে ধারণা করা হচ্ছে হত্যাকারী পরিবারেরই কেউ হতে পারেন। তবে আমরা এখনো নিশ্চিত নই।’ নিহতদের সুরতহাল প্রতিবেদন প্রস্তুত করে মরদেহগুলো ময়নাতদন্তের জন্য এমএজি ওসমানী মেডিকেল কলেজ মর্গে পাঠানো হয়েছে বলেও জানান তিনি।

আলোচিত এ হত্যাকাণ্ডের খবর পেয়েই সিলেট রেঞ্জের ডিআইজি মফিজ উদ্দিন আহম্মেদ পিপিএম ও জেলা পুলিশ সুপার মোহাম্মদ ফরিদ উদ্দিন পিপিএমসহ পুলিশের উর্ধ্বতন কর্মকর্তারা ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেন। পরিদর্শন শেষে এ বিষয়ে সিলেট জেলা পুলিশ সুপার মোহাম্মদ ফরিদ উদ্দিন সাংবাদিকদের বলেন, ‘দুটি সম্ভাব্য কারণকে সামনে রেখে পুলিশ কাজ করছে। এর একটির হচ্ছে পার্শ্ববর্তী রাধানগর গ্রামে শ্যালিকার বিয়ে নিয়ে স্ত্রীর সঙ্গে স্বামীর ঝগড়া। আরেকটি হচ্ছে হিফজুর রহমান তার মামার বাড়িতে থাকেন। মায়ের সম্পত্তির ভাগ মামার বাড়ি থেকে আদায় নিয়ে বিরোধ রয়েছে। এ দুটি কারণকে সামনে রেখে মামা-মামিসহ আশপাশের অন্তত পাঁচ থেকে ছয়জনকে আমরা প্রাথমিকভাবে জিজ্ঞাসাবাদ করেছি।’ তিনি আরো বলেন, ‘আশা করছি খুব শিগগিরই আমরা এই হত্যাকাণ্ডের ক্লু-উদঘাটন করতে পারব। পুলিশের একাধিক বিভাগের লোকজন এ নিয়ে কাজ করছে।’

এমন চাঞ্চল্যকর ঘটনায় নিহত আলিমার স্বামী হিফজুরের দিকে সন্দেহের তীর ছোড়ছেন কেউ কেউ । আবার অনেকে মনে করছেন হিফজুর একজন হতদরিদ্র মানুষ, সে কীভাবে এমন ঘটনা ঘটাতে পারে? সিলেটের গোয়াইনঘাটে দিনমজুরের পরিবারে তিন সদস্যকে নির্মমভাবে কুপিয়ে হত্যার আলোচিত এ হত্যাকাণ্ডের রহস্য উদঘাটনে একযোগে কাজ করছে পুলিশের ডিবি ও সিআইডিসহ একাধিক শাখা। শিগগিরই ধরা পড়বে দুর্বৃত্তরা।

বুধবার বিকেলে সহকারী পুলিশ সুপার (গোয়াইনঘাট সার্কেল) প্রভাষ কুমার সিংহ গণমাধ্যমকে জানান, পুলিশ দুটি বিষয়কে সামনে রেখে বড় এ হত্যাকাণ্ডের তদন্ত কাজ চালিয়ে যাচ্ছে। হিফজুরের সঙ্গে তার মামার জমি সংক্রান্ত বিরোধ রয়েছে। এর জের থেকে হত্যাকাণ্ড ঘটে থাকতে পারে। আবার স্ত্রীর সঙ্গেও হিফজুরের বিরোধ রয়েছে। তাই হিফজুরকেও সন্দেহের বাইরে রাখা যাচ্ছে না। হিফজুরের জ্ঞান ফিরলেও তিনি স্বাভাবিকভাবে কথা বলার অবস্থায় নেই। তাই তাকে জিজ্ঞাসাবাদ করতে বিলম্ব হচ্ছে। তিনি পুলিশ হেফাজতে ওসমানী হাসপাতালে চিকিৎসাধীন। তিনি আরো বলেন, হিফজুরের জ্ঞান ফিরার পর তার কথা বলার মতো অবস্থা হলে তাকে জিজ্ঞাসাবাদ করা হবে। তখন আশা করছি আসল বিষয় বেরিয়ে আসবে। এ ঘটনায় কাউকে এখনও আটক করা হয়নি বলেও জানান সহকারী পুলিশ সুপার প্রভাষ কুমার সিংহ।

আমাদের দৈনিক জৈন্তা বার্তার গোয়াইনঘাট উপজেলা প্রতিনিধি জানান- হিফজুর রহমান পেশায় দিনমজুর। উল্লেখ করার মেতা তার নিজের কোনা সম্পদ নেই। একেবারেই হতদরিদ্র। মামার বাড়িতে থাকেন। মায়ের তরফ থেকে পাওয়া জমিতে মাটির একটা ঘর করেছেন। সেখনেই স্ত্রী আর দুই সন্তান নিয়ে বাস করতেন। এই ভাঙা ঘরেই মঙ্গলবার রাতের কোনো এক সময় অথবা বুধবার ভোরে ঢুকে পড়ে আঁতাতায়ী ঘাতকরা। হিফুজরের স্ত্রী ও দুই শিশু সন্তানকে কুপিয়ে হত্যান্ড চালায় দুর্বৃত্তরা। কুপানো হয় দিনমজুর  হিফুজরকেও। তবে ভাগ্যক্রমে বেঁচে যান তিনি। বুধবার সকালে পুলিশ তাকে উদ্ধার করে ওসমানী হাসপাতালে প্রেরণ করেছে। তার অবস্থাও আশঙ্কাজনক। এদিকে, ঘরে ঢুকে তিনজনকে হত্যার ঘটনায় গোয়াইনঘাট উপজেলাজুড়ে চাঞ্চল্যের সৃষ্টি হয়েছে। এলাকার বিপুল সংখ্যক মানুষ ওই বাড়িতে ভিড় করেছেন।

উল্লেখ্য, হিফুজর তার মামার বাড়িতে ঘর বানিয়ে থাকেন। তার বাড়ি পাশ্ববর্তী গ্রামে। আহত হিফজুর যে ঘরে থাকতেন ওই ঘরটি তার মায়ের পৈত্রিক সম্পত্তি থেকে প্রাপ্ত। আর পাশের আরও দুটি ঘরে তার মামারা থাকেন। হিফজুর দিনমজুরের কাজ করে জীবিকা নির্বাহ করেন। তার মামাসহ প্রতিবেশীদের জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়েছে। তবে এ প্রতিবেদন লেখা পর্যন্ত কাউকে আটক করেনি পুলিশ।

শাহিদ হাতিমী স্টাফ রিপোর্টার

জুন / ১৬ / ২০২১
১০:০০ অপরাহ্ন

আপডেট : জুলাই / ২৯ / ২০২১
০৯:৪১ অপরাহ্ন

সিলেট