মে / ০৬ / ২০২১ ০৪:০৭ অপরাহ্ন

মোঃলুৎফুর রহমান

এপ্রিল / ৩০ / ২০২১
০৭:৫৮ অপরাহ্ন

আপডেট : মে / ০৬ / ২০২১
০৪:০৭ অপরাহ্ন

সিলেটের ইফতারি প্রথা একটি সামাজিক ব্যাধি


সিলেটের ঐতিহ্যবাহী 'ফুড়ির বাড়ীতে 'ইফতারী

163

Shares

বৃহত্তর জনপদ সিলেটে রয়েছে নিজস্ব ইতিহাস-ঐতিহ্যে। আপন স্বকীয়তায় এখানকার মানুষ উদ্ভাসিত। সিলেটের মানুষের চাল-চলন, আতিথেয়তা, সংস্কৃতি, স্বতন্ত্র ঐতিহ্যের সুনাম দেশ ছাড়িয়ে সুদূর বিদেশেও বিস্তৃত। অতিথি আপ্যায়নে সিলেটের মানুষের রয়েছে দারুণ সুখ্যাতি। এক সময় সিলেটে ছিল সম্পদ ও প্রাচুর্যে ভরপুর।এই জন্য বিখ্যাত পর্যটক ইবনে বতুতা সিলেটকে " দোযখপুর নিয়ামত পুর"  বলে আখ্যায়িত করেছেন।

এক সময় সিলেট অঞ্চলে ফল-ফলাদির গাছ -গাছালিতে ছিল অপ্রতুল। অতিথি হিসেবে কারো বাড়িতে যাবার সময় নানান কিসিমের মৌসুমী ফল-ফলাদি, মিষ্টি-মিঠাই বা পছন্দমতো যে কোনো জিনিস সঙ্গে করে নেওয়ার রেওয়াজও ছিল যা  এখনো অনেকটা বিদ্যমান রয়েছে।মেয়ে বাবার বাড়িতে বেড়াতে আসলে, শশুরবাড়ী যাবার সময় বাশের তৈরী ঝুড়ি ভর্তি করে সন্দেশ, বাহারী ধরণের পীঠা তৈরী করে পাঠানো হত।সাথে দেওয়া হত বাড়ীতে উৎপাদিত গাছের নানান ধরনের ফল-ফলাদি।আম-কাঠাল,আনারস,লিচুও। আগেকার দিনে মেয়ের বাড়িতে ইফতার পাঠানো হতো, আম-কাঠাল পাঠানো হতো। তার পিছনে যুক্তি ছিল, তখন যাতায়াত ব্যবস্থা উন্নত ছিলো না।রাস্তাঘাট পাকা ছিল না,গাড়িঘোড়ার সুব্যবস্থা ছিলনা।শুকনো মৌসুমে পায়ে হেটে, বর্ষার সময় পাল তোলা নৌকায় মেয়েরা বাপের বাড়িতে যাতায়াত করত।ধনি শ্রেণীর মেয়েরা চার বেয়ারার পালকি করে বাপের বাড়িতে যায়াত করত।তাই অতি সহজে কথায় কথায় বাপের বাড়ি আসা যেতো না। ভালো-মন্দ কিছু খেতে গেলে অনুপস্থিত সন্তানের কথা বাবা, মায়ের মনে পড়বে- এটা স্বাভাবিক। তাই সম্ভব হলে মেয়েকে একদিন ডেকে চোখের সামনে বসিয়ে খাওয়ানোর ইচ্ছা থেকেই দাওয়াত দেয়া হতো। শুধু মেয়ে-জামাইকে দাওয়াত দেয়াটাও সামাজিক ভাবে অসভ্যতা ছিলো, তাই হয়তো মেয়ের শ্বশুরবাড়ী পুরো পরিবারই আমন্ত্রিত হতেন। কিন্তু যারা দূরে থাকতেন তাদেরই হয়তো আয়োজন করে ইফতার, ফলফলাদি, পিঠা-চিড়া পাঠানো হতো।

বিশেষ করে  রমজান মাসে মেয়ের শ্বশুর বাড়িতে ইফতারি নিয়ে যাওয়ার রেওয়াজ দীর্ঘ দিন আগ থেকে প্রচলিত। সিলেটি ভাষায় যেটাকে বলা হয় ‘ফুরির বাড়ি ইফতারি’। শুধুমাত্র মেয়ের বাবা ইফতারী দিতেন এমন নয়,বিয়েতে যিনি উকিল (স্বাক্ষী)  তার বাড়ি থেকেও ইফতারি পাঠানোর রেওয়াজ রয়েছে।এছাড়া ইয়ারানা (বন্ধুত্ব) করলে, ইয়ারের বাড়ি থেকেও রমজানে ইফতারি পাঠানো হত। মেয়ের বাড়িতে পাঠানো ইফতারী শুধু মেয়ের বাড়ির মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে না। বন্ধু-বান্ধব আর আত্মীয় স্বজনকে দাওয়াত দেয়া হয় এবং সেই সঙ্গে একটি নীরব প্রতিযোগিতা চলে। কার শ্বশুরবাড়ি থেকে কত বেশি আইটেমের ইফতার এলো, কে তার শ্বশুরবাড়ির ইফতার কয়'শ মানুষকে দাওয়াত দিয়ে খাওয়াল। গ্রামের মাতব্বর, যুব সমাজ, মেম্বার, চেয়ারম্যান, পাড়া প্রতিবেশী, বোনের জামাই,আত্নীয় স্বজন, সবাইকে শশুরবাড়ীর ইফতারি খাওয়ানোর জন্য ঘটা করে দাওয়াত না দিলে যেন মান -সম্মান শেষ।মেয়ের বাড়িতে ইফতার, আম-কাঠাল” পাঠানোর রেওয়াজ ল সিলেটি সমাজে আঁকড়ে আছে যে মনে হবে এটা একটা অবশ্য পালনীয় কর্তব্য। না দিলেই নয়। বিয়ের প্রথম বছরে ১লা রোজায় একবার, রোজার মাঝামাঝি একবার আর শেষের দিকে একবার- কম করে হলেও তিনবার তো ইফতারি দিতেই হবে। আর সে ইফতারি যেমন তেমন নয়। একেবারে বিশাল যজ্ঞ। বিরাট বিরাট দুই/তিন ডেকচি আখনী পোলাও  এক ডেকচি চানা-ভুনা, পিঁয়াজু, বেগুনী, জিলাপি, মিষ্টি, দই, নিমকিসহ সব ধরণেরর ফলমুল, হালিম আর হলো “বাখরখানী”। তবে এ বাখরখানী ঢাকার বাখরখানী নয়, এটা একধরনের মিষ্টি লাচ্ছা পরোটার মতো সিলটী বাখরখানি। বড় ইফতারি হলে আয়োজনও অনেক বড় হয়। বৌ এর ইফতারি আসবে এ উপলক্ষে বরের বন্ধু-বান্ধব, আত্মীয় স্বজন সবাইকে দাওয়াতের উৎসব পড়ে যায়।বাদ পড়েন নি পাড়া-প্রতিবেশী আত্মীয় স্বজন।পিক আপ ভ্যান, সিএনজি,নোহা গাড়িতে আবার অনেকে ১০-১৫ টা ঠেলাগাড়ীতে করে ধুম-ধাম করে মেয়ের বাড়িতে ইফতার পাঠান।গ্রামের মধ্যে বাড়ি বাড়ি লোক পাঠিয়ে মেয়ের বাবার বাড়ি থেকে পাঠানো  ইফতার বিলি করা হয়। যার যার সামর্থ্য অনুযায়ী মেয়ের বাড়িতে ইফতার পাঠানোর ব্যবস্থা করা হয়ে থাকে। বাড়ির বৌদের বাপের বাড়ি থেকে ইফতারি আসার ফাঁকে দেখা যায় বৃদ্ধা শাশুড়ীরর বাপের বাড়ি থেকেও ইফতার আসছে। রোজার মাসে এই ইফতারির যন্ত্রণায় অনেকে অস্থির থাকেন।আশেপাশের বাসা/বাড়ী থেকে প্রায় প্রতিদিনই ইফতার আসে। যার শ্বশুরবাড়ি থেকে যত বেশি ইফতার আসে তার ততো বেশী  সুনাম।কালের আবর্তনে দীর্ঘ দিনের পুরানো সিলেটের ইফতারি প্রথা বর্তমানে সামাজিক ব্যাধিতে পরিণত হয়েছে।এটি সামাজিক মর্যাদা  প্রমাণের কুসংস্কারের অন্যেতম হাতিয়ার হয়ে দাঁড়িয়েছে। 

মেয়ের শশুরবাড়ীর লোকেরা গ্রামের মানুষ অথবা পাড়া/মহল্লার মানুষের মধ্যে ইফতার সামগ্রী বিতরণ করে ঘটা করে খাওয়ায়।কিন্তু বিপত্তী বাজে নিন্ম বিত্তের পরিবারে। নিন্ম বিত্তের আয় সীমিত। দ্রব্য মুল্যের উর্ধব গতির কারণে এই সীমিত আয় দিয়ে সংসার চালানো অনেক কঠিন।মেয়ের বাড়িতে ঘটা করে ইফতারি দেওয়া নিন্ম বিত্তের কাছে বাড়তি বোঝা হয়ে দাড়িয়েছে। আবার  মেয়ের বাবার আর্থিক সক্ষমতা কম হওয়ায়  ইফতার দিয়ে খুশি করতে না পারলে অনেক ক্ষেত্রে সেজন্য কথা শুনতে হয় মেয়েকে। শশুরবাড়ী কর্তৃক মান সম্মত ইফতারি না হলে বন্ধু বান্ধব, আত্বীয় স্বজন কর্তৃক স্বামীকে সম্মানহানি হতে হয় এবং অনেক খোচা কথা শুনতে হয়।যার প্রভাব গিয়ে বউর উপর পড়ে।অনেক ক্ষেত্রে স্বামী কর্তৃক মানসিক ও শারীরিক নির্যাতনের স্বীকার হতে হয়।শশুড়,শাশুড়ী, ননদী, দেবর, দেবরের বউ,পাড়া-পড়শীর নানান খোচা কথা শুনতে হয় মেয়েকে। হয়তো মেয়েটি জানে তার বাবার অবস্থা তবুও শ্বশুরবাড়িতে নিজের সম্মানজনক অবস্থান ধরে রাখতে অনেক সময় ভেতরে চাপা কষ্ট নিয়েই বাবাকে অনুরোধ করে। মেয়ের আবদার ফেলতে পারেন না বাবা। যেভাবেই হোক টাকা সংগ্রহ করেন। অনেকে জমি বন্ধক দেন, গ্রামীণ সমিতি, ক্ষুদ্র ঋণ সংস্থা থেকে সুদে টাকা ঋণ করেন।কেউ হালের বলদ,গোয়ালের গরু,ছাগল বিক্রী করেন। আবার অনেকে মেয়ের মন রক্ষা ও সম্মান বাচাতে জমি জামা বিক্রী করে মেয়ের বাড়িতে ইফতারির ব্যবস্থা করেন।অনেক পরিবার আছে বাবা মা অসুস্থ। বাবা, মা চিকিৎসা না করিয়ে ওষুধের টাকা দিয়ে মেয়ের বাড়িতে ইফতারি পাঠান।ভাইয়ের টিউশন ফি, বোনের ঈদের কাপড় কেনার টাকা দিয়ে হলেও বোন এবং বোনের জামাইকে খুশী করতে হয়। আবার ইফতার সামগ্রী মন মত না হলে বিরাট ঝামেলা তৈরী হয়।প্রথমে পারিবারিক কলহ,ঝগড়াঝাটি চুড়ান্ত অবস্থায় মেয়েকে চিরতরে  ফিরে যেতে হয় গরীব বাবার কুটিরে।আবার অনেকে চাপা কষ্ট সহ্য করতে না পেরে আত্বহত্যার পথ বেছে নেয়। ২০১৯ সালের  রমজানের চার মাস আগে শামীম আহমদের সঙ্গে হেলেনা বেগমের (২০) বিয়ে হয়। ১০ মে ২০১৯ ইং বিয়ের পর প্রথম রমজান মাসে সিলেটের জৈন্তাপুরের ঘিলাতৈল গ্রামে বধু হেলেনার বাবার বাড়ি থেকে শ্বশুরবাড়িতে ইফতারি পাঠানো হয়। কিন্তু সেই ইফতার সামগ্রী শশুড়বাড়ির লোকজনের মনমত হয়নি। শ্বশুর বাড়ির লোকজনের গালমন্দ ও অশালীন কথাবার্তা  শুনতে হয় হেলেনাকে। এরই জেরে নিজ ঘরে সিলিং ফ্যানের সঙ্গে গলায় রশি পেঁচিয়ে আত্মহত্যা করেন হেলেনা। একটা কু-প্রথা ও কুসংস্কারে অকালে ঝরে একটি জীবন।হেলেনার গল্প ছাড়া ও পর্দার আড়ালে  কতশত হেলেনাকে দিনের দিনের পর দিন চাপা কষ্ট,  অপমান আর সামাজিক মানসম্মানের ভয়ে নিরবে কাঁদতে হয়। মৌলভীবাজার সদর উপজেলার তারিক আহমেদ ২০১৮ সালে রমজানের ১ মাস আগে ৮ লক্ষ টাকা খরচ করে একমাত্র বোনের বিয়ে দেন। একমাত্র বোনের  ধুমধামে বিয়ে দিতে গিয়ে ৫ লাখ টাকা ঋণ করেন।  বিয়ের একমাস পর ঋণের চাপের মধ্যেই আসে রমজান।

তাই সিলেট ঐতিহ্য মেনে বোনের বাড়ি ইফতার সামগ্রী পাঠাতে হবে। কিন্তু হাতে একটাকাও নেই। আগের ঋণ রয়ে গেছে, তাই নতুন করে টাকা ধার দিচ্ছেনা কেউ। এদিকে ইফতার না পাঠালে বোনকে কথা শুনতে হবে, পাড়া প্রতিবেশির কাছে বোনের ইচ্ছত সম্মান থাকবেনা, লোক লজ্জার ভয় তার উপর ঐতিহ্য। তাই বাধ্য হয়ে হালের শেষ গরুটি বিক্রি করেন ৭০ হাজার টাকায়। সে টাকা দিয়ে ইফতার সামগ্রী নিয়ে যান। বোনের বাড়িতে প্রচুর মানুষ দাওয়াত দেওয়া হয়। যার কারণে ৭০ হাজার টাকার ইফতারে সবার হয়নি। বেশী লোকের সমাগম হওয়ায় শেষ পর্যন্ত ইফতারের টানা পড়ে।অনেকে না পাওয়া ক্ষোভ প্রকাশ করে।এই নিয়ে তাকে এবং নব বিবাহিতা বোনকে শুনতে হয় নানান কথা।

এই ইফতারী প্রথা কালক্রমে মারাত্মক আকারে সামাজিক জুলুমে পরিণত হয়েছে।এটা কখনোই ইসলাম সমর্থন করেনা।আত্বীয়ের হক আদায় করা সুন্নত।রমজান শরীফে রোজাদারদের ইফতার করানো সওয়াবের কাজ। কিন্তু সওয়াব করতে গিয়ে ঋণ গ্রস্ত হওয়া,সুদে ঋণ উত্তোলন করা,শেষ সম্বল জমি জামা ও গৃহপালিত পশু বিক্রী করে নিঃশ্ব হয়ে যাওয়াকে ইসলাম সমর্থন করেনা।আবার ইফতারি না দেওয়ার কারণে মেয়েকে মানসিক ও শারীরিকভাবে অত্যাচার করা, হেয় প্রতিপন্ন করা, সামাজিকভাবে ছোট চোখে দেখা,অশালীন ভাষায় গালিগালাজ করা, বাপের বাড়ীতে পাঠিয়ে দেওয়া স্পষ্ট জুলুমের কাজ। ইসলাম কখনোই জুলুমকে সমর্থন করেনা। তবে আশার বাণী হল, বর্তমান তরুণ প্রজন্ম ইফতারী প্রথা চায় না।তারা বিভিন্ন সময় সোস্যাল মিডিয়ায় ইফতারি প্রথার বিরুদ্ধে স্টেটাস দিয়ে তাদের মতামত পেশ করছে এবং জনমত গঠন করছে।তবে ঐক্যবদ্ধ হয়ে সামাজিক আন্দোলন ও গণসচেতনতা তৈরীর মাধ্যমে  এই সামাজিক ব্যাধি থেকে মুক্তি পাওয়া যেতে পারে।


অন্যান্য