জুন / ১৭ / ২০২১ ১২:৩২ অপরাহ্ন


কালো ছত্রাক নিয়ে আতঙ্ক নয়, সাবধান হোন

মিউকরমাইকোসিস বা ব্ল্যাক ফাঙ্গাস বিশেষ ধরনের আণুবীক্ষণিক ছত্রাকের সংক্রমণজনিত বিভিন্ন রোগকে বোঝায়। এর মধ্যে রাইজোপাস প্রজাতি হলো সবচেয়ে বেশি দায়ী, তবে অন্যান্য জীবাণু যেমন মিউকর, কানিংহামেলা, অ্যাফোফিজোমাইসেস, লিচথিমিয়া, সাকসেনিয়া, রাইজোমুকর এবং অন্যান্য প্রজাতিও এই রোগের কারণ।

এই ছত্রাক সর্বব্যাপী—মাটি, পানি ও বাতাসে ছড়িয়ে থাকলেও সংক্রমণক্ষমতা এতই কম যে এক লাখ মানুষের মধ্যে মাত্র এক–দুজনের এই জীবাণু সংক্রমণ হতে পারে। কিন্তু কোনো কারণে শরীরের রোগপ্রতিরোধক্ষমতা কমে গেলেই কেবল এই সংক্রমণের মাত্রা বেড়ে যেতে পারে, যেটা এক লাখে ২০ থেকে ৩০ জন হতে পারে। অনিয়ন্ত্রিত ডায়াবেটিস রোগী, বিশেষত কিটো অ্যাসিডোসিসে আক্রান্তরা উচ্চ ঝুঁকিতে থাকে। তা ছাড়া ক্যানসারে আক্রান্ত রোগী, অতিরিক্ত ব্রড-স্পেকট্রাম অ্যান্টিবায়োটিকের ব্যবহার, অন্তঃসত্ত্বা মহিলা, অত্যধিক স্টেরয়েড গ্রহণ করা, কিডনি বা অন্য অঙ্গ প্রতিস্থাপন করা রোগী এবং চরম অপুষ্টিজনিত রোগীদের ব্ল্যাক ফাঙ্গাসের সংক্রমণ হতে পারে। চামড়ার গভীর ক্ষত ও পোড়া ঘায়েও এই রোগ হতে দেখা যায়। ইদানীং ভারতের কোনো কোনো স্থানে করোনায় আক্রান্ত রোগীদের মধ্যে আশঙ্কাজনক হারে ব্ল্যাক ফাঙ্গাসে আক্রান্ত হওয়ার খবর পাওয়া যাচ্ছে, কিন্তু বাংলাদেশে এখনো এই রোগের প্রাদুর্ভাবের খবর পাওয়া যায়নি।

মিউকর পরিবেশে মোল্ড হিসেবে থাকলেও শরীরের অভ্যন্তরে ঢুকে হাইফা বা তন্তু আকারে পরিণত হয়। এগুলো বৃদ্ধি পেতে শুরু করলে ছত্রাকের হাইফাগুলো রক্তনালিগুলোতে আক্রমণ করে, যা থেকে থ্রম্বোসিস ও টিস্যু ইনফার্কশন, নেক্রোসিস এবং শেষ পর্যন্ত গ্যাংগ্রিন তৈরি করে। সুস্থ মানুষের রক্তের শ্বেত রক্তকণিকা বা নিউট্রোফিল এই ছত্রাকের বিরুদ্ধে মূল প্রতিরক্ষার কাজ করে থাকে। সুতরাং নিউট্রোপেনিয়া বা নিউট্রোফিল কর্মহীনতায় (যেমন ডায়াবেটিস, স্টেরয়েড ব্যবহার) আক্রান্ত ব্যক্তিরা সর্বোচ্চ ঝুঁকিতে থাকেন। একই কারণে এইডসে আক্রান্ত রোগীদের মধ্যে এই সংক্রমণের হার বেশি দেখা যায়।

আক্রান্ত অঙ্গের ওপর ভিত্তি করে মিউকরমাইকোসিস রোগটি ছয় ধরনের। যথা: ১. রাইনো সেরেব্রাল—নাক, নাকের ও কপালের সাইনাস, চোখ ও ব্রেন বা মস্তিষ্কের সংক্রমণ ২. ফুসফুসীয় ৩. আন্ত্রিক ৪. ত্বকীয় ৫. অভ্যন্তরীণ বা ডিসেমিনেটেড এবং ৬. অন্যান্য।

এই ছত্রাক মানুষের শরীরে শ্বাসনালি ও নাকের মধ্য দিয়ে, খাবারের সঙ্গে বা ত্বকের কোনো ক্ষত বা প্রদাহের মধ্য দিয়ে প্রবেশ করে থাকে। আক্রান্ত অংশ আর নাকের শ্লেষ্মা, কফ, চামড়া ও চোখ কালো রং ধারণ করে বলে একে কালো ছত্রাক নামে ডাকা হয়। মিউকরমাইকোসিসে আক্রান্ত রোগীদের মধ্যে দ্রুত এবং সঠিক চিকিৎসা না করতে পারলে ৫০ শতাংশ থেকে ৮০ শতাংশ রোগী মৃত্যুবরণ করে থাকে। আর অভ্যন্তরীণ সংক্রমণের মৃত্যুর হার ১০০ শতাংশের কাছাকাছি।

রোগনির্ণয় ও চিকিৎসা

ঝুঁকিপূর্ণ রোগীদের ক্ষেত্রে সংক্রমণের শুরুতে রোগ সন্দেহ করা ও নির্ণয় করা অত্যাবশ্যক। রক্ত পরীক্ষা, বুকের ও সংশ্লিষ্ট অঙ্গের এক্স-রে, আলট্রাসনো, শ্লেষ্মা, চামড়া ও মাংসের টিস্যু বায়োপসি, সিটি স্ক্যান ও এমআরআই পরীক্ষা করাতে হবে। উচ্চ মৃত্যুহারের ভয় থাকায় সময় নষ্ট না করে চিকিৎসা শুরু করতে হবে। ছত্রাকবিরোধী ওষুধ বা অ্যান্টিফাঙ্গাল ড্রাগ জরুরিভাবে শুরু করতে হবে। পাশাপাশি ঝুঁকিসমূহ যেমন ডায়াবেটিস নিয়ন্ত্রণ ও রোগ প্রতিরোধক্ষমতাকে বৃদ্ধি করার চেষ্টা করতে হবে। প্রয়োজনে আক্রান্ত অঙ্গে সার্জারি করতে হতে পারে বা কোনো কোনো সময়ে তা কেটে ফেলে দিয়ে জীবন রক্ষা করতে হতে পারে।

ইদানীং ভারতের মহারাষ্ট্র ও অন্যান্য প্রদেশে মারাত্মক কোভিড-১৯ সংক্রমণের মধ্যে নতুন করে দেখা দিচ্ছে ব্ল্যাক ফাঙ্গাস বা মিউকরমাইকোসিস। দীর্ঘদিন রোগভোগ, অতিরিক্ত স্টেরয়েড ও অ্যান্টিবায়োটিকের ব্যবহার এ ক্ষেত্রে মুখ্য ভূমিকা পালন করছে বলে মনে হয়। ভারতজুড়ে আতঙ্ক সৃষ্টি হলেও শুরুতেই ভালোমতো চিকিৎসা করলে এই রোগকে দমন করে অনাকাঙ্ক্ষিত মৃত্যু ঠেকানো সম্ভব। গত সপ্তাহে ভারতে কোভিড রোগীদের হোয়াইট বা শ্বেত ছত্রাক সংক্রমণ দেখা দেওয়ায় বাড়তি আতঙ্কের সৃষ্টি হয়েছে। কালো ছত্রাকের মতো শ্বেত ছত্রাকের উপসর্গ ও চিকিৎসা একই রকম হলেও এ ব্যাপারে সতর্ক হওয়া প্রয়োজন।

বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রীর সঠিক পরিকল্পনায় ও বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়সহ সংশ্লিষ্ট চিকিৎসকদের আপ্রাণ প্রচেষ্টায় আমরা কোভিড-১৯-এর বৈশ্বিক মহামারিকে যথাসাধ্য নিয়ন্ত্রণ করতে সফল হয়েছি। আমাদের দেশে ব্ল্যাক ফাঙ্গাসের কোনো রোগী এখনো পাওয়া যায়নি। হোয়াইট ফাঙ্গাসের কোনো রোগীর খবরও পাওয়া যায়নি। আশা করি, সতর্কতা অবলম্বন করলে এই রোগ থেকে সবাই নিরাপদ থাকতে পারবে। তারপরও যদি সংক্রমণ ঘটে, ভয়ের কোনো কারণ নেই। এ রোগের ওষুধ আমাদের হাতে রয়েছে, সঠিকভাবে প্রয়োগ করে আমরা রোগীর আরোগ্য নিশ্চিত করতে পারব। সুতরাং আতঙ্ক নয়, সাবধানতা দরকার।

● ডা. মো. শারফুদ্দিন আহমেদ বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের ভাইস চ্যান্সেলর