সেপ্টেম্বর / ২৮ / ২০২১ ১২:৪২ অপরাহ্ন

প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার আম কূটনাতি: বঙ্গবন্ধুর লালগালিচা এবং ভবিষ্যতের বাংলাদেশ

আবদুল কাদের তাপাদারঃ স্বাধীনতার পরপরই পাকিস্তানের শাসকগোস্টীকে ঢাকায় লালগালিচা সংবর্ধনা দিয়েছিলেন বাংলাদেশের স্হপতি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর ওরহমান। স্বাধীনতার চিহ্নিত শত্রুদের কেনো তিনি লালগালিচার আয়োজন করেছিলেন? কারণ তিনি ভারতকে রক্তে-মাংসে চিনতেন। তিনি পাকিস্তানসহ দক্ষিণ এশিয়ার অন্যান্য দেশের সাথে সুসম্পর্ক গড়তে চেয়েছিলেন ভারত নির্ভরতা কমাতে।

মুক্তিযুদ্ধে বিশাল সহযোগিতার বিনিময়ে তিনি তাঁর মাতৃভূমিকে কারো হাতের পুতুল বানাতে চাননি। পাকিস্তান থেকে দিল্লি হয়ে দেশে ফেরার সময় তাই বঙ্গবন্ধু ইন্দিরা গান্ধীর কাছে জানতে চেয়েছিলেন, ' আমার দেশ থেকে কখন আপনার সৈন্য ফেরত নিয়ে আসবেন '! অবাক বিস্ময়ে ভারতের প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধী কি বলবেন ভেবে পাচ্ছিলেন না। দ্বিতীয়বার বঙ্গবন্ধুর মুখে একই প্রশ্ন শুনে ইন্দিরা গান্ধী আমতা আমতা করে জবাব দিয়েছিলেন, হ্যাঁ সৈন্য তো ফিরিয়ে আনবো।

মক্কায় ওআইসি সম্মেলনে যেতে বঙ্গবন্ধুকে বাধা দেয়া হয়েছিল। তিনি বুক ফুলিয়ে বলেছিলেন, আমি মুসলমানের বাচ্চা।মুসলমান রাস্ট্রের সম্মেলনে আমি অবশ্যই যাবো।কেউ আমাকে আটকাতে পারবে না। তিনি তাই করেছিলেন। ভারতের সাথে সুসম্পর্ক রেখেই বঙ্গবন্ধু পাকিস্তান, সৌদি আরবসহ মুসলিম বিশ্ব ও চীনসহ দক্ষিণ এশিয়ার সাথে সম্পর্ক গড়ার কাজ শুরু করেছিলেন।

আমাদের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা পাকিস্তানে আম পাঠিয়ে একটা যুগান্তকারী পদক্ষেপ নিয়েছেন। দীর্ঘদিনের শীতল সম্পর্কে কিছুটা উষ্ণতা তৈরির জন্য তাঁর এই আম কূটনীতি বেশ প্রশংসিত হচ্ছে। চীনের সাথেও একটা সুসম্পর্ক গড়েছে শেখ হাসিনার সরকার। আমি পাকিস্তানের সাথে নতুন সম্পর্ককে সাধুবাদ জানাই। আমাদের স্বাধীনতা সংগ্রামের অকৃত্রিম বন্ধু, প্রতিবেশি ভারতের সাথে অবশ্যই আমাদের সুসম্পর্ক দরকার। এটা ঠিক রেখেই আমাদেরকে বিশেষ করে চীন রাশিয়া, সৌদি আরব, ইরান, পাকিস্তান, তুরস্কসহ মুসলিম দুনিয়া ও দক্ষিণ এশিয়ার সাথে সম্পর্ক গভীরভাবে এগিয়ে নিতে হবে। সৌদি আরবে ভারত ও পাকিস্তানের এককোটি মানুষ কাজ করে। হজের মওসুমে হাজিদের পানি সরবরাহের কাজ করে ভারতের বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠান। সৌদি রাজ পরিবারের সাথে পাকিস্তানের সাবেক প্রধানমন্ত্রী নওয়াজ শরিফের রয়েছে পারিবারিক সম্পর্ক।

ক্ষমতায় থাকাকালীন ২০১৩ সালে পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী নওয়াজ শরিফের কাছে খবর আসে যে,সৌদি আরব ভারতকে ২৫ লাখ শ্রমিক ভিসা দিচ্ছে। শুনেই তিনি পাগলপারা হয়ে যান।বিশেষ বিমানে ছুটে যান সৌদির রাজপরিবারের বিশেষ আমন্ত্রণ নিয়ে। দরকষাকষির এক পর্যায়ে সৌদি আরব সরকার পাকিস্তানের জন্য ৩০ লাখ ভিসা দেবে বলে সিদ্ধান্ত জানিয়ে দেয়।শান্ত হোন নওয়াজ শরিফ। স্বস্তিতে ফিরে আসেন দেশে।

ধনাঢ্য আরব দেশগুলোতে রয়েছে আমেরিকা,বৃটেনসহ বিশ্বের প্রভাবশালী রাস্ট্রের সম্পর্ক ও সুদূরপ্রসারী প্রভাব। এসব সম্পর্ক কাজে লাগিয়ে ভারত পাকিস্তান নিজেদের অবস্থান পাকাপোক্ত করছে। বাগিয়ে আনছে কোটি কোটি ডলারের বৈদেশিক রেমিট্যান্স। আমাদেরকে একথা মাথায় রাখতে হবে যে, ভারত মুসলিম প্রধান দেশ না হয়েও মুসলিম দুনিয়ার সাথে তাদের কেনো এতো সম্পর্ক? তারা এর মাধ্যমে ধনী মুসলিম দেশগুলোতে এক সুদূরপ্রসারী প্রভাব জিইয়ে রেখেছে।যেটা বাংলাদেশের জন্য অপরিহার্য ছিল।

একথা অবশ্যই স্বীকার করে নিতে হবে যে,রাস্ট্রপতি জিয়াউর রহমান মুসলিম দুনিয়ার সাথে বাংলাদেশের বিশেষ একটা সুসম্পর্ক তৈরি করে প্রভূত উন্নতির দিকে নিয়ে গেছেন দেশকে।বললে অতুক্তি হবে না যে, এটা তিনি বঙ্গবন্ধুর নীতির পথেই বাড়তে চেয়েছিলেন। জেনারেল এরশাদ ক্ষমতা দখলের পর ভারতের সাথে সুসম্পর্ক রাখার পাশাপাশি মুসলিম দুনিয়ার সাথেও সমানতালে সম্পর্ক গড়ে তোলেন।এমনকি ধনাঢ্য আরব জাহানের রাজতান্ত্রিক শাসকদের কারো কারো সাথে তিনি পারিবারিক সম্পর্ক গড়ে তোলেন।

আরব আমিরাতের শাসকদের সাথে এরশাদ ব্যক্তিগত সুসম্পর্ক গড়তে সক্ষম হন।এরফলে এরশাদ আমলে সংযুক্ত আরব আমিরাতে বাংলাদেশের শ্রমবাজারের প্রভূত উন্নতি সাধিত হয়। এমনকি বাংলাদেশের বড়ো বড়ো ব্যবসায়ীদের তিনি আমিরাতে বিশেষ সুবিধা দিতে অনেক কাজ এগিয়ে নেন। পরবর্তীতে বিএনপি আমলেও মুসলিম দুনিয়ার সাথে বাংলাদেশের কূটনৈতিক সম্পর্কের বেশ চমৎকার অগ্রগতি হয়। পাশাপাশি দক্ষিণ এশিয়ার সাথেও সেসময় বাংলাদেশের সম্পর্ক নানাভাবে গভীরে পৌঁছে।

আওয়ামী লীগের শাসনামলে ভারতের সাথে সুসম্পর্ক বজায় থাকলেও চীনসহ মুসলিম বিশ্বের সাথে সম্পর্ক সেরকম গভীরতায় পৌঁছাতে পারেনি বাংলাদেশ। এক্ষেত্রে ভারত মুসলিম প্রধান না হয়েও তাদের স্বার্থ চিন্তা করে ইসলামি দুনিয়ার সাথে তারা চমৎকার সম্পর্ক গড়ে তোলেছে। ঠিক সেরকম পাকিস্তানও চীনসহ দক্ষিণ এশিয়ার সাথে তাদের গভীর সম্পর্ক বজায় রেখ রেখেছে। আধুনিক পৃথিবীতে পরাশক্তির সঙ্গে মিলেমিশে বাংলাদেশের অনেক গুরুত্বপূর্ণ বিষয় নিয়ে এগিয়ে যেতে হয়।

নিজের সম্মান, স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্ব টিকিয়ে রাখার সিদ্ধান্ত নিতে হয়। বাংলাদেশের সামনে অপার সম্ভাবনা। বিশ্বের একটা অন্যতম প্রধান মুসলিম রাস্ট্র বাংলাদেশের এই সম্ভাবনাকে আটকে দিতে চায় কেউ কেউ। তাই বাংলাদেশের পররাষ্ট্র নীতকে ঢেলে সাজানোর উদ্যোগ নেয়া দরকার। কোভিট-১৯ এর এই সময়ে বাংলাদেশ গুরুত্বপূর্ণ কারণে সারা বিশ্বের সাথে নানামাত্রীকে সম্পর্ক গড়ার ক্ষেত্রে একটা ঐতিহাসিক ও যুগান্তকারী ভূমিকা পালন করতে পারে।