জানুয়ারী / ১৮ / ২০২২ ০৪:৪৯ পূর্বাহ্ন

আবুল হারিছ চৌধুরীর উত্থান, পতন!

আবদুল কাদের তাপাদার :

সময় তখন ১৯৯৪ সাল। একক সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিয়ে ক্ষমতায় বিএনপি। খালেদা জিয়া প্রধানমন্ত্রী। তখনও ক্ষমতার তেমন একটা লাইমলাইটে নেই হারিছ চৌধুরী। নয়া পল্টনে আশা কার ভিশন নামে একটা গাড়ির শো রুম তাঁর।এখানেই তার আড্ডা চলে পরিচিতজনদের সাথে। সিলেটে দৈনিক দিনকালের নতুন প্রতিনিধি আমার এলাকার স্নেহভাজন ও জুনিয়র বন্ধু শাহান চৌধুরী( বর্তমানে যুক্তরাজ্য প্রবাসী)। ঢাকায় এক দুপুরে নিয়ে গেলো আমাকে আশা কার ভিশনে।তখন দৈনিক জালালাবাদ ঢাকার কিছু সিলেটীদের হাতে পৌঁছতো। আমার সাথে হারিছ ভাইয়ের সরাসরি এর আগে পরিচয় না থাকলেও আমাকে দেখেই লাফিয়ে উঠলেন মনে হলো। আমার অনেক রিপোর্ট তিনি পড়েছেন বললেন। আমাদেরকে আপ্যায়ন করালেন। অনেক গল্প করলেন
সরকারের গুরুত্বপূর্ণ বিষয় নিয়ে। একটু ক্ষোভ ঝাড়লেন তৎকালীন প্রভাবশালী অর্থমন্ত্রী এম সাইফুর রহমানকে নিয়ে। মনে হলো তাঁর সম্পর্ক উনার সাথে ভালো যাচ্ছে না।আমি যা বোঝার বুঝে নিলাম। শেষে তাঁকে নিয়ে বিশেষভাবে লেখার অনুরোধ জানালেন আমাকে।তাঁর মুখের ভাষাটা আজো আমার মনে আছে: "আমারারে লেখিয়া তুলিয়া দেওরেবে ছোট ভাই আমারে মনো রাখিও তোমার লেখালেখিতে" তাঁর কথার রেশ ফুরাতেই শাহান হেসে বলে উঠলো, "কাদের ভাই লেখলে আপনি ঠিকু উঠিজিবা" কয়েক বছর পর ২০০১ এ জোট সরকারের ভূমিধস বিজয়ের পর তিনি ক্ষমতার লাইমলাইটে হাজির হন। প্রতিমন্ত্রীর মর্যাদায় প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়ার রাজনৈতিক সচিব হিসেবে নিয়োগ লাভ করেন তিনি। মর্যাদা প্রতিমন্ত্রীর হলেও অনেক পূর্ণ মন্ত্রীর চেয়েও তিনি ছিলেন ক্ষমতাবান। এ যেনো হাতে আসমান পাওয়ার মতো ক্ষমতা তাঁর। প্রথমে যেদিন তিনি সিলেট আগমন করেন আমাকে আগেই ফোন দিয়েছিলেন এয়ারপোর্টে গেলে তিনি খুশি হবেন এই বলে। সেসময়কার তুখোড় একজন রিপোর্টার হিসেবে আমারও অনেক আগ্রহ তাকে রিসিভ করার চালচিত্র দেখার। সেদিনকার সিলেট এয়ারপোর্ট যেনো এক রাজপুত্রের আগমনের জন্য অপেক্ষা করছিলো। সিলেটের প্রশাসনের সকল স্তরের শীর্ষ স্হানীয় ব্যক্তিদের বিমানবন্দরে উপস্থিতি এতোটাই ছিলো যে আমি এর আগে বা পরে, এমনকি কোনো প্রধানমন্ত্রীর রিসিভ করার দিনও এমন বিস্ময়কর দৃশ্য আমি অবলোকন করিনি। আমরা কয়েকজন সাংবাদিক ভিআইপি পাসে একেবারে বিমান অবতরণের পাশেই গিয়ে হাজির হই। যার ফলে সবকিছু অবলোকন করার সুযোগ হয়েছিল আমাদের। সেদিনকার হারিছ চৌধুরীকে মনে হয়েছিল প্রভাবশালী অর্থমন্ত্রী সাইফুর রহমানের অনেক বড় মাপের মানুষ। ভিআইপি লাউঞ্জে এসে একে একে পুলিশ প্রশাসন, সিভিল প্রশাসনসহ সকল বিভাগের শীর্ষ কর্মকর্তারা তাঁদের পরিচয় দিয়ে সালাম দিচ্ছিলেন আর হারিছ চৌধুরী রাজপুত্রের মতো মৃদু হাসিতে সকলের অবস্থান জেনে নিচ্ছিলেন। বিএনপির সে আমলে হাওয়া ভবন কেন্দ্রীক ক্ষমতার যে বলয় গড়ে উঠেছিলো হারিছ চৌধুরী ছিলেন অন্যতম প্রভাবশালী ব্যক্তিত্ব। প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়ার খুব কাছাকাছি থাকায় তিনি হয়ে উঠেছিলেন একজন নীতি নির্ধারক। একবার হঠাৎ শোনা গেলো তিনি একদিন একটা বিমানে চড়ে একাই সিলেট আসেন। বিকেলে আবার ফিরে যান। ঢাকায় ফিরে যাওয়ার পর সিলেটের সাংবাদিকরা জানতে পারেন এই ঘটনা। অনুসন্ধান শুরু হয়।পরে নিশ্চিত হওয়া যায় ঘটনা ঠিকই আছে। বাংলাবাজার পত্রিকা তখন সিলেটে চলে হাজার হাজার কপি।হটকেকের মতো। শিরোনাম করেছিলোঃ এক রাজপত্তুরের সিলেট আগমন!
অনেক হৈচৈ এই ঘটনা নিয়ে। ক্ষমতার কেন্দ্রে থাকায় এমন আরও কতো ঘটনা। যেগুলো আজ ইতিহাসের পাতায় স্হান করে নিয়েছে। কানাইঘাটে সুরমা নদীর উপর সেতু নির্মাণসহ বেশকিছু বড় উন্নয়ন প্রকল্প তাঁর হাত দিয়েই সম্পন্ন হয়েছে। বিএনপির ক্ষমতার পতনের সাথে সাথে দেশ থেকে বিদেশে পালিয়ে যান বিএনপির এই ডাকসাইটে দাপুটে নেতা। যদিও তার ব্যবসায়ীর বা ক্ষমতার অংশিদার সাবেক স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী লুৎফুজ্জামান বাবর, মামুন এখনো কারাগারে বন্দী জীবন কাটাচ্ছেন। আমাদের সিলেটের একজন বড় নেতার এভাবে মৃত্যু আমি চাইনি। আল্লাহ তাঁকে ক্ষমা করে দিয়ে জান্নাতবাসী করুন।
গত কয়েক মাস থেকেই তাঁর মৃত্যুর খবর ছড়িয়েছে!
কেউ বলেছেন তিনি ইরানে মারা গেছেন। কেউ বলেছেন ভারতে তার নানাবাড়িতে আছেন।আবার কেউ কেউ দাবি করেছেন তিনি ঢাকায় মারা গেছেন। তবে তিনি যে লন্ডনে মারা গেছেন এমন তথ্য কেউ এর আগে নিশ্চিত করতে পারেননি। অবশেষে জানা গেলো লন্ডনের একটি হাসপাতালে মারা গেছেন পলাতক বিএনপি নেতা আবুল হারিছ চৌধুরী। তিনি করোনায় ভুগছিলেন। গত বছর আগস্টে করোনায় আক্রান্ত হয়ে সুস্থও হন। হারিছ চৌধুরীর মৃত্যুর সংবাদটি নিশ্চিত করেছেন তার চাচাতো ভাই সিলেট জেলা বিএনপির সাবেক সহ-সভাপতি ও কানাইঘাটের সাবেক উপজেলা পরিষদ চেয়ারম্যান আশিক চৌধুরি।
আজ বুধবার গণমাধ্যমকে বিষয়টি নিশ্চিত করেন আশিক উদ্দিন চৌধুরী। তিনি বলেন, প্রায় সাড়ে তিন মাস আগে যুক্তরাজ্যে হারিছ চৌধুরী মারা গেছেন। তাঁর বয়স হয়েছিল প্রায় ৬৮ বছর। তিনি স্ত্রী, এক ছেলে ও এক মেয়ে রেখে গেছেন। তাঁর দাফন যুক্তরাজ্যেই সম্পন্ন হয়েছে।
হারিছ চৌধুরীর মৃত্যুর সময় আশিক উদ্দিন চৌধুরী যুক্তরাষ্ট্রে অবস্থান করছিলেন বলে জানান। তিনি বলেন, ‘যে সময় তিনি মারা যান, আমি যুক্তরাষ্ট্রে অবস্থান করছিলাম। চাচাতো ভাই মারা যাওয়ার বিষয়টি মুঠোফোনে জানতে পারি। হারিছ চৌধুরীর স্ত্রী জোসনা আরা চৌধুরী, ছেলে নায়েম শাফি চৌধুরী ও মেয়ে সামিরা তানজিন চৌধুরী যুক্তরাজ্যে অবস্থা করছেন। সিলেটের কানাইঘাটের দিঘিরপাড় পূর্ব ইউনিয়নের দর্পনগর গ্রামে হারিছ চৌধুরীর গ্রামের বাড়ি। বাড়িতে কেউ থাকেন না।’
মঙ্গলবার (১১ জানুয়ারি) নিজের ফেসবুক স্ট্যাটাসে হারিছ চৌধুরীর মৃত্যুর খবর জানান তার চাচাতো ভাই সিলেট জেলা বিএনপির সাবেক সহ-সভাপতি আশিক চৌধুরী।
চারদলীয় জোট সরকারের আমলে প্রতিমন্ত্রীর মর্যাদায় প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়ার রাজনৈতিক সচিব ছিলেন হারিছ চৌধুরী। হাওয়া ভবন কেন্দ্রীক সে সময় তারেক রহমানের নেতৃত্বাধীন ক্ষমতার যে বলয় গড়ে উঠেছিলো সেই বলয়ের অন্যতম নীতিনির্ধারক ছিলেন তিনি। সে সময়ের প্রভাবশালী এই নেতা বিএনপি ক্ষমতাচ্যুত হওয়ার পরই দেশ ছেড়ে পালিয়ে যান। তার বিরুদ্ধে ব্যাপক দুর্নীতির অভিযোগ ওঠে। ২০১৮ সালের ২১ আগস্ট গ্রেনেড হামলা মামলার রায়ে যাবজ্জীবন সাজা হয় হারিছ চৌধুরীর।
আশিক চৌধুরী ফেইসবুক স্ট্যাটাসে লেখেন, ‘ভাই বড় ধন, রক্তের বাঁধন’। নিজের ছবির সঙ্গে হারিছ চৌধুরীর একটি ছবি যুক্ত করে তিনি এই স্ট্যাটাস দেন। এরপর স্ট্যাটাসের নিচে বিএনপি ও অঙ্গ সংগঠনের নেতাকর্মীরা ‘ইন্নালিল্লাহি... রাজিউন’ লিখে কমেন্ট করতে থাকেন। অনেকে হারিছ চৌধুরীকে নিয়ে আফসোসও প্রকাশ করেন।
আশিক চৌধুরী জানান, হারিছ চৌধুরী গত বছরের আগস্টের মাঝামাঝি লন্ডনে করোনায় আক্রান্ত হন। হাসপাতালে চিকিৎসা নিয়ে তিনি বাসায় ফেরেন। কয়েকদিন পর তার করোনা রিপোর্ট নেগেটিভও আসে।
করোনার ধকল সাময়িকভাবে কাটিয়ে উঠলেও তার ফুসফুস মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়। ফুসফুসের সংক্রমণ বেড়ে যাওয়ায় এক পর্যায়ে তিনি গুরুতর অসুস্থ হয়ে পড়েন। সেপ্টেম্বরের শেষের দিকে যুক্তরাজ্যের একটি হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থান মারা যান হারিছ চৌধুরী।
জানা গেছে, স্ত্রী ও ছেলে-মেয়ে নিয়ে হারিছ চৌধুরী যুক্তরাজ্যে থাকতেন। তার ছেলে জনি চৌধুরী পেট্রোলিয়াম ইঞ্জিনিয়ার। আর মেয়ে মুন্নু চৌধুরী ব্যারিস্টার। আগে থেকেই হারিছ চৌধুরী ব্ল্যাড ক্যান্সারসহ নানা জটিল রোগে ভুগছিলেন। ২০০২ সালে তিনি যুক্তরাষ্ট্রে গিয়ে একবার রক্ত পরিবর্তন করে আসেন। দেশ থেকে পালানোর পর তিনি যুক্তরাজ্যে আরেকবার রক্ত পরিবর্তন করেন বলে জানা গেছে।
পারিবারিক সূত্রে জানা যায়, আক্রান্ত হওয়ার আগে হারিছ চৌধুরী করোনার দুই ডোজ ভ্যাকসিন নিয়েছিলেন। করোনা আক্রান্ত হওয়ার পর তার রক্তে অক্সিজেনের পরিমাণ কমে যায় এবং পুরো ফুসফুস সংক্রমিত হয়ে পড়ে। ফলে করোনা নেগেটিভ হওয়ার পরও তিনি ফুসফুস জটিলতায় ভুগছিলেন।
জানা যায়, ২০০৭ সালে দেশে জরুরি অবস্থা জারির সপ্তাহখানেক পর স্ত্রীকে নিয়ে গ্রামের বাড়ি সিলেটের কানাইঘাট উপজেলার দর্পনগরে বেড়াতে আসেন হারিছ চৌধুরী। ওই রাতেই যৌথবাহিনী তার বাড়িতে অভিযান চালায়। তবে তাকে পায়নি। এরপর কয়েক দিন সিলেটের বিভিন্ন স্থানে আত্মগোপনে থাকেন।
বিএনপি সরকারের দাপুটে এই নীতিনির্ধারক ২০০৭ সালের ২৯ জানুয়ারি জকিগঞ্জ সীমান্ত দিয়ে পালিয়ে যান । এরপর তিনি ভারতের আসাম রাজ্যের করিমগঞ্জ জেলার বদরপুরে নানার বাড়িতে ওঠেন। সেখান থেকে পাকিস্তান হয়ে ইরানে তার ভাই আবদুল মুকিত চৌধুরীর কাছে পৌঁছান এমন খবরও চাউর হয়।
ইরানে কয়েক বছর থেকে তিনি যুক্তরাজ্যে পরিবারের কাছে যান। সেখান থেকে ভারতে যাতায়াত করতেন এবং ব্যবসা-বাণিজ্য দেখভাল করতেন বলে একাধিক সূত্র বিভিন্ন সময় নিশ্চিত করেছে।
প্রসঙ্গত, ২১ আগস্ট গ্রেনেড হামলা মামলায় ২০১৮ সালে যাবজ্জীবন সাজা হয় হারিছ চৌধুরীর। একই বছরের ২৯ অক্টোবর জিয়া চ্যারিটেবল ট্রাস্ট দুর্নীতি মামলায় তার ৭ বছরের জেল ও ১০ লাখ টাকা জরিমানা হয়। এছাড়া সাবেক অর্থমন্ত্রী শাহ এএমএস কিবরিয়া হত্যা মামলায়ও হারিছ চৌধুরী ও সিলেট সিটি করপোরেশনের মেয়র আরিফুল হক চৌধুরীসহ ২৮ জনের বিরুদ্ধে অভিযোগ গঠন করা হয়।