অগাস্ট / ১৪ / ২০২২ ০৭:২৭ অপরাহ্ন

জৈন্তা বার্তা ডেস্ক

মে / ১৮ / ২০২২
১২:৫৪ পূর্বাহ্ন

আপডেট : অগাস্ট / ১৪ / ২০২২
০৭:২৭ অপরাহ্ন

সিলেটে বন্যা পরিস্থিতির ভয়াবহ রূপ

শহরে হু-হু করে ঢুকছে পানি



142

Shares

সিলেটে বন্যা পরিস্থিতি ভয়াবহ আকার ধারণ করেছে। বৃষ্টি কমলেও ঢলের পানি অব্যাহত থাকায় সিলেটে সবকটি নদী বিপদসীমা অতিক্রম করে। সুরমা নদী উপচে পানি প্রবেশ করছে সিলেট মহানগরীর বিভিন্ন পাড়া-মহল্লায়। এ অবস্থায় মানুষের ভোগান্তি চরম আকার ধারণ করেছে। সিলেটের জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ে কন্ট্রোল রুম খোলা হয়েছে। উজানে বৃষ্টি ও ঢল অব্যাহত থাকায় বন্যা পরিস্থিতি আরও খারাপ হতে পারে বলে আশঙ্কা পানি উন্নয়ন বোর্ডের। ইতোমধ্যে পানিবন্দি হয়ে পড়েছেন জেলার লক্ষাধিক মানুষ। গত ১৮ বছরের মধ্যে এবারই সবচেয়ে বড় বন্যা হয়েছে। উজানে বৃষ্টি না থামলে বন্যা পরিস্থিতির আরও অবনতি হবে। ১৮ বছর আগে ২০০৪ সালে এমন পানি হয়েছিল। 

পানি উন্নয়ন বোর্ডের তথ্য মতে, সিলেটের উজানে ভারতের চেরাপুঞ্জিতে গত পাঁচ দিনে ১২৩৮ মিলিমিটার বৃষ্টি হয়েছে। অবিরাম বৃষ্টি ঝরছে সিলেটেও। ফলে দ্রুত বাড়ছে নদনদীর পানি।
মঙ্গলবার দুপুর পর্যন্ত সুরমা নদীর পানি অমলসীদ ও কানাইঘাট পয়েন্টে প্রায় ১৫০ সেন্টিমিটার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। আর সিলেট সদরে ৩০ সেন্টিমিটার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হয়েছে। পানির তোড়ে জেলার বিভিন্ন এলাকায় ইতোমধ্যেই ভেঙে গেছে ২০টি নদীরক্ষা বাঁধ। এ ছাড়া কুশিয়ারা, সারি ও গোয়াইন নদীর পানিও বিপৎসীমার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে।

সিলেট নগরীর উপশহর, সোবহানিঘটে, কালিঘাট, ছড়ারপাড়, শেখঘাট, তালতলা, মাছিমপুরসহ বিভিন্ন এলাকা ঘুরে দেখা গেছে, এসব এলাকার বাসাবাড়ি, দোকানপাট ও বিভিন্ন স্থাপনায় পানি ঢুকে পড়েছে। ওইসব এলাকার লোকজন জানান, সকালে ঘুম থেকে উঠে দেখেন বাসার ভেতরে পানি ঢুকে পড়েছে। পুরো এলাকায় বন্যার পানি দেখা দেয়ায় আতঙ্ক বিরাজ করছে। জানা গেছে, নদী পানিতে ভরাট থাকায় ড্রেনের পানি নামছে না সুরমায়। পাড়ায় পাড়ায় ড্রেনের তরল বর্জ্য অলি-গলি পেরিয়ে বাসায় ঢুকতে শুরু করেছে।

নগরীর মাছিমপুরের বাসিন্দা সাংবাদিক সুনীল সিংহ সোমবার রাত সাড়ে ১২টায় জানান, সুরমার পানি উপচে রাতে তার বাসায় পানি প্রবেশ করেছে। তার উঠানে হাঁটু সমান পানি। আর শুটকি বাজারের রাস্তায় কোমর সমান পানি। পাড়ার রাস্তা-ঘাট পানির নিচে। মাছিমপুর ও ছড়ারপারে অনেক বাড়ি-ঘরে পানি প্রবেশ করেছে। এ অবস্থায় স্থানীয় বাসিন্দারা আতঙ্কের মধ্যে রয়েছেন।

জকিগঞ্জ ও কানাইঘাটে সুরমা নদীর ডাইক ভেঙে হু হু করে বন্যার পানি বাড়ছে। সিলেটের সাথে কানাইঘাট ও গোয়াইনঘাটের সড়ক যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন রয়েছে। অব্যাহত পানি বৃদ্ধির কারণে ছাতকের সাথে সিলেটের সড়ক যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হবার পথে। ছাতকে পাথর ক্রাশার মিল ও নদীতে বার্জ কার্গো লোডিং বন্ধ থাকায় বিপুল সংখ্যক শ্রমিক মানবেতর জীবনযাপন করছেন। কোম্পানীগঞ্জ উপজেলা পরিষদ মাঠে হাঁটু সমান পানি। বন্যা প্লাবিত অনেক স্থানে নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ সরবরাহ ও যোগাযোগ ব্যবস্থা ব্যাহত হওয়ায় মানুষ চরম দুর্ভোগে পড়েছেন।

পানি উন্নয়ন বোর্ড (পাউবো)-এর তথ্য অনুযায়ী, সোমবার বিকাল ৩টা পর্যন্ত সিলেটে সুরমা নদীর পানি বিপদসীমা ছুঁই ছুঁই করে। সন্ধ্যা ৬টায় সুরমা নদীর পানি বিপদসীমার ১০ সেন্টিমিটার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হয়। রাতে পানি আরো বাড়তে থাকায় বিভিন্ন নালা দিয়ে নগরীতে পানি প্রবেশ করতে থাকে।

এদিকে, সোমবার সন্ধ্যা ৬টায় সুরমার পানি সিলেটের কানাইঘাটে বিপদসীমার ১৪৩ সেন্টিমিটার, একই সময়ে কুশিয়ারার পানি অমলশীদে বিপদসীমার ১০৩ সেন্টিমিটার, শেওলায় কুশিয়ারা বিপদসীমার ৩৫ সেন্টিমিটার এবং জৈন্তাপুরে সারিঘাট নদীর পানি বিপদসীমার ২ সেন্টিমিটার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে।

সিলেট আবহাওয়া অফিসের সিনিয়র আবহাওয়াবিদ সাঈদ আহমদ চৌধুরী জানান, সিলেটে সোমবার থেকে বৃষ্টিপাতের পরিমাণ কমেছে। তবে উজানে ভারতীয় ভূখণ্ডে বৃষ্টি হচ্ছে, এ কারণে ঢল নামছে। ফলে নদ-নদীর পানি বৃদ্ধি অব্যাহত রয়েছে।

এদিকে, বন্যার উদ্ভূত পরিস্থিতিতে সিলেট জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ে কন্ট্রোল রুম খোলা হয়েছে। সিলেট জেলা ত্রাণ ও পুনর্বাসন কর্মকর্তা নূরুল ইসলাম জানিয়েছেন, জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে বন্যা পরিস্থিতি মনিটরিং করা হচ্ছে। তিনি জানান, গতকাল সোমবার পর্যন্ত বন্যার্তদের মাঝে ১২৯ মেট্রিক টন চাল ও ১ হাজার বস্তা শুকনা খাবার বিতরণ করা হয়েছে।

জৈন্তাপুর টানা বৃষ্টি ও পাহাড়ি ঢলে বন্যায় উপজেলার ৬টি ইউনিয়ন প্লাবিত হয়েছে। সারী ও বড় নয়াগাং নদীর পানি স্বাভাবিকের চেয়ে বিপদসীমার দশমিক ৫৫ সেন্টিমিটার উপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। অনেক শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ও গ্রামীণ রাস্তাঘাট পানিতে তলিয়ে গেছে। স্থানীয় জনসাধারণ নৌকা দিয়ে চলাচল করছেন।

গতকাল মঙ্গলবার সরেজমিনে দেখা গেছে, গত কয়েক দিনের অব্যাহত বৃষ্টি ও পাহাড়ি ঢলে পানিবন্দি হয়ে পড়েছে নিজপাট, জৈন্তাপুর, চারিকাটা, দরবস্ত, ফতেপুর ও চিকনাগুল ইউনিয়নের বেশিরভাগ এলাকার মানুষ। বন্যায় আটকেপড়া লোকজনকে গৃহপালিত পশু নিয়ে উঁচু স্থানে আশ্রয় নিতে দেখা গেছে। বন্যায় পরিস্থিতি ও বন্যায় আটকা পড়াদের খোঁজ খবর নিতে এলাকা পরিদর্শন করেছেন প্রশাসন ও জনপ্রতিনিধিগণ। বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে বন্যা আশ্রয়ন কেন্দ্র চালু করা হয়েছে।

এদিকে,  উজান থেকে নেমে আসা পাহাড়ি ঢলের পানিতে প্লাবিত গোয়াইনঘাট উপজেলা। একদিকে বিদ্যুৎ নেই সেই সাথে যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন। উপজেলা সদরসহ হাটবাজার তলিয়ে যাওয়ায় অসহনীয় দুর্ভোগ পোহাচ্ছেন উপজেলাবাসী। সিলেট নগরীর সাথে উপজেলা সদরের যোগাযোগ ব্যবস্থা সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন রয়েছে। এছাড়া, উপজেলা সদরের সাথে ১২টি ইউনিয়নের প্রায় ৪ লাখ জনগোষ্ঠীর যোগাযোগ ব্যবস্থাও বিচ্ছিন্ন রয়েছে। বিপুল সংখ্যক ঘর বাড়িতে পানি উঠেছে। গ্রামীণ রাস্তা ঘাট বানের পানিতে তলিয়ে গেছে। শতকরা ৯০ ভাগ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে পানি উঠে পাঠদান ব্যাহত হচ্ছে। অনেক হাট-বাজারে পানি উঠায়, হাটবাজারে অচলাবস্থা দেখা দিয়েছে। বোরো ও আউশের বীজতলা এবং বোনা আমনের ব্যাপক ক্ষতির আশঙ্কা রয়েছে। কৃষকেরা গবাদি পশু নিয়ে রয়েছেন বিপাকে। চরম গো-খাদ্যের অভাব দেখা দিয়েছে। গোয়াইনঘাট উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মো. তাহমিলুর রহমান জানান, গোয়াইনঘাটে বন্যা পরিস্থিতির অবনতি হচ্ছে। ইতোমধ্যে ত্রাণ কার্যক্রম শুরু হয়েছে। সরকারের কাছে পর্যাপ্ত ত্রাণ মজুদ আছে। এ কার্যক্রম চলমান থাকবে। এছাড়া ৪৭ টি আশ্রয়কেন্দ্র প্রস্তুত রাখা হয়েছে বলে জানান তিনি।

কানাইঘাট উপজেলার সার্বিক বন্যা পরিস্থিতির চরম অবনতি হয়েছে। টানা বর্ষণ ও উজান থেকে নেমে আসা পাহাড়ি ঢলে তৃতীয় দিনেও পৌর শহরের প্রশাসন পাড়াসহ পুরো উপজেলা বন্যার পানিতে প্লাবিত হয়েছে। ভয়াবহ বন্যায় পানিবন্দি হয়ে পড়েছেন পুরো উপজেলার বিপুল সংখ্যক মানুষ। গতকাল মঙ্গলবার দুপুরে সুরমা নদীর পানি বিপদসীমার ১৪৫ সে. মি. উপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছিল।

কানাইঘাটের সুরমা ডাইকের গৌরিপুর-কুওরঘড়ি এলাকায় ৬টি ভাঙন কবলিত পয়েন্ট দিয়ে তীব্রগতিতে পানি প্রবাহিত হওয়ায় কানাইঘাট বাজার, থানা গেইট, উপজেলা প্রশাসন পাড়ায় বানের পানি ঢুকে পড়ে। বিভিন্ন এলাকায় কাঁচা বাড়ি-ঘর বিধ্বস্ত হওয়ার খবর পাওয়া গেছে। এখনও উপজেলার বেশিরভাগ ইউনিয়নের হাজার হাজার বাড়ি-ঘর বন্যার পানিতে তলিয়ে যাওয়ায় লক্ষাধিক মানুষ পানিবন্দি হয়ে মানবেতর ভাবে জীবন যাপন করছেন।

কোম্পানীগঞ্জে বর্ষণ অব্যাহত থাকায় ও উজান থেকে নেমে আসা ঢলে বন্যা পরিস্থিতির অবনতি হয়েছে। গ্রামীণ কাঁচা-পাকা রাস্তাগুলো পানিতে তলিয়ে গেছে। উপজেলা পরিষদের মাঠে হাঁটু সমান পানি। থানা কম্পাউন্ডের ভেতরে পানি প্রবেশ করেছে। উপজেলা সদরের কয়েকটি পাকা সড়ক জলমগ্ন হয়ে পড়েছে।

বন্যার পানিতে তলিয়ে গেছে আউশধানের বীজতলা ও শাকসবজিসহ বিভিন্ন ফসল। অনেক পুকুর ও মৎস্য খামারের মাছ ভেসে যাওয়ার খবরও পাওয়া গেছে। গবাদিপশু নিয়ে দুর্ভোগে পড়েছেন মানুষ। রাস্তাঘাট পানিতে নিমজ্জিত থাকায় শিক্ষা কার্যক্রম অঘোষিতভাবে বন্ধ রয়েছে।

জৈন্তা বার্তা ডেস্ক

মে / ১৮ / ২০২২
১২:৫৪ পূর্বাহ্ন

আপডেট : অগাস্ট / ১৪ / ২০২২
০৭:২৭ অপরাহ্ন

সিলেট